১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৃতীয় ভাষা চালুর আগে দরকার সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি

Published: November 4, 2026, 5:12 pm

নতুন শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগটি একদিকে যেমন সময়োপযোগী, অন্যদিকে এর যথাযথ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে রয়ে গেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কেন্দ্র স্থাপনের কথা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বিদেশি ভাষাটি অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি কতটা, সেটিই বিবেচনার বিষয়। প্রয়োজনীয় শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে, এটি বড় প্রশ্ন। ছোট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ভাষা মডেল। ভারতে নতুন ফাঁদে ‘বাংলা ভাষা’, মুক্তির পথ কী।

প্রস্তাবিত আটটি ভাষার মধ্যে রয়েছে আরবি, চীনা, জাপানি, কোরীয়, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ ও ইতালীয়। এই ভাষাগুলো আয়ত্ত করতে পারলে শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে। তবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার বিদ্যালয়ে একই ব্যবস্থা কার্যকর করা এক বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি জোগাড় করা যতটা সহজ, প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সেই পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জটিল ও শ্রমসাধ্য কাজ। ‘রেমিট্যান্সের ভাষা’ আরবি, তবু প্রশিক্ষণে এত অবহেলা কেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ শিক্ষকের প্রাপ্যতা। বিদেশি ভাষা শেখানোর জন্য শুধু ভাষাজ্ঞান যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী পাঠদান এবং নিয়মিত মূল্যায়নের দক্ষতা। বর্তমানে কোন ভাষার জন্য কতজন শিক্ষক লাগবে, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, বেতন-ভাতা কিংবা পেশাগত উন্নয়নের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো জনসমক্ষে আসেনি। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সম্মানী নিশ্চিত না করা গেলে এই কর্মসূচি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্কুলপর্যায়ে তৃতীয় ভাষা পড়ানোর জন্য অনেক শিক্ষক লাগবে।

তদুপরি, শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভিজাত স্কুলগুলো বাড়তি ফি দিয়ে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ করতে পারলেও গ্রামের স্কুলগুলোর অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। যেখানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেটের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধারই অভাব রয়েছে, সেখানে বিদেশি ভাষা শিক্ষার বাড়তি চাপ ডিজিটাল ও ভাষাগত বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। শহরের অভিজাত স্কুল হয়তো বাড়তি ফি নিয়ে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান ভিত্তি নিয়েও সংশয় রয়েছে। ২০২৩ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী দেড় হাজারের বেশি শিশুর মধ্যে দেখা গেছে যে, প্রায় ৬২ শতাংশ ছেলে এবং ৫৩ শতাংশ মেয়ে বাংলা গল্প পড়তেই পারছে না। ইংরেজির ক্ষেত্রে এই হার আরও আশঙ্কাজনক; ছেলেদের প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং মেয়েদের প্রায় ৮৩ শতাংশ মৌলিক পাঠদক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়েই যখন শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজিতে দুর্বল, তখন আরেকটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া তাদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ওই জরিপের তথ্য বলছে, বাংলায় গল্প পড়তে পারেনি প্রায় ৬২ শতাংশ ছেলে ও ৫৩ শতাংশ মেয়ে। অর্থাৎ অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক পাঠদক্ষতাই অর্জন করতে পারছে না (, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।

শিক্ষার্থীর আগ্রহ, ভবিষ্যৎ পেশা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে ভাষা নির্বাচনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। সবার ওপর একই ভাষা বাধ্যতামূলক না করে পেশাভিত্তিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যেমন, কেউ মধ্যপ্রাচ্যে স্বাস্থ্যসেবা বা আতিথেয়তা খাতে কাজ করতে চাইলে আরবি ভাষা শিখতে পারে, আবার প্রযুক্তি বা শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে জাপানি বা কোরীয় ভাষা সহায়ক হতে পারে। তবে কেবল ভাষা জানা মানেই বিদেশে ভালো চাকরি নিশ্চিত হওয়া নয়; এর পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা ও কাজের অভিজ্ঞতা থাকা অপরিহার্য। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ছে, তাই ম্যান্ডারিন শেখার আলাদা গুরুত্ব আছে।

সরকারি এই উদ্যোগ সফল করতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ডিপ্লোমা কর্মসূচি চালুর পাশাপাশি দেশি শিক্ষক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় ডিজিটাল উপকরণ ও প্রশিক্ষিত অনলাইন শিক্ষকের সমন্বয় ঘটানো যেতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার কখনোই একজন দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না। সরকারের এ উদ্যোগ সফল করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ভাষানীতি ও কর্মপরিকল্পনা দরকার।

বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এগোনোই যুক্তিযুক্ত। প্রথমে নির্বাচিত কিছু বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়ে শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এবং পাঠ্যক্রমের উপযোগিতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এই অভিজ্ঞতার আলোকে পরে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা সম্প্রসারণ করা উচিত। পরিশেষে বলা যায়, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তবে এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, উপযুক্ত পরিবেশ এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা। ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এই বাস্তবতার ওপর জোর দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক দক্ষ শিক্ষক রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। এরপর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্য স্কুলে সম্প্রসারণ করা উচিত।