
বিদায়ের ঠিক আগে লিওনেল মেসির সাম্প্রতিক ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে এক অন্য রকম আবহ তৈরি করেছে। হোটেল কক্ষে প্রবেশ, আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে শেষবারের মতো অনুশীলন কিংবা অনুশীলনের ফাঁকে বিশ্রামের মুহূর্ত—সবখানেই মেসির মুখে দেখা গেছে চওড়া হাসি। বিদায়ের চিরায়ত যে বিষণ্ন সুর বিশ্বজুড়ে বাজছে, তার বিপরীতে মেসির এই প্রশান্ত হাসি ভক্তদের মনে কৌতূহল জাগিয়েছে। হয়তো সবকিছু জয় করার এক পরম তৃপ্তি লুকিয়ে আছে এই হাসির আড়ালে। হোটেলে ঢোকার সময় মেসি, আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে শেষ অনুশীলনে মেসি, সেটির ফাঁকে ফাঁকে একটু জিরিয়ে নেওয়ার সময় মেসি। বিদায় রাগিণী মানেই তো বিষাদময় করুণ এক সুর। তাহলে মেসির মুখে বিষণ্নতার ছাপ নেই কেন।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গতিপথকে ২০১৬ সালের আগের ও পরের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ২০১৬ সালের আগে ছিল একের পর এক ফাইনাল হারের হাহাকার ও হতাশার গল্প, যা তাঁকে সাময়িক অবসরের সিদ্ধান্তেও ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রাপ্তির খাতা পূর্ণ হয়েছে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের পরম আরাধ্য সোনালী ট্রফিতে। যদিও ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারের স্বাদ পেতে হয়েছে, যা জিতলে হয়তো তাঁর এই রূপকথার মতো পথচলা আরও নিখুঁত হতো। তবে ফুটবল থেকে তাঁর আর কিছুই পাওয়ার বাকি নেই। বিদায়বেলায় মেসির এই মুখের হাসি হয়তো সেই পূর্ণতারই বহিঃপ্রকাশ।
অবশ্য বিদায়ের মূল মুহূর্তটি যখন সামনে আসবে, তখন কি এই হাসি ধরে রাখতে পারবেন মেসি? যখন ঘরের মাঠে আকাশি-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন, তখন আবেগের জোয়ারে ভেসে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। ইতিপূর্বে কাতার বিশ্বকাপেও দর্শক তাঁর আবেগঘন রূপ দেখেছে। তবে বিদায় নিশ্চিত জেনেই এবার মাঠে নামছেন ফুটবলের এই জাদুকর।
বুয়েনস এইরেসের ঐতিহ্যবাহী মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রতিপক্ষ হিসেবে খেলছে বেনিন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৯৩ নম্বরে থাকা আফ্রিকার এই দেশটি কখনোই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি। এই ঐতিহাসিক ম্যাচে তারা কেবলই এক পার্শ্বচরিত্র। তবে মেসির বিদায়ের মঞ্চ হিসেবে ইতিহাসে বেনিনের নামও চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের অবসান ঘটার মুহূর্ত হিসেবে এই ম্যাচটি টিকে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। কখনো বিশ্বকাপ না খেলা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৯৩ নম্বর আফ্রিকার এই দেশ এখানে নিছকই সিনেমার ‘এক্সট্রা’।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে মেসি হয়তো আরও কিছুদিন খেলা চালিয়ে যাবেন, তবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁকে আর কখনোই দেখা যাবে না। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে যে আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসিকে দেখার অভ্যাস গড়ে উঠেছে ফুটবলপ্রেমীদের, আর্জেন্টিনার পরবর্তী ম্যাচগুলোয় দর্শক চোখ হয়তো মনের ভুলেই মেসিকে খুঁজে বেড়াবে। তারপর হঠাৎ করেই মনে পড়বে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসি এখন শুধুই সুন্দর এক অতীত। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির সেরা ১০ মুহূর্ত দেখে নিন।
ফুটবল খেলা যত দিন বেঁচে থাকবে, মেসির সৃষ্টি করা বিশেষ মুহূর্তগুলো তত দিনই মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউবের কল্যাণে তাঁর খেলা দেখার আনন্দ সবসময়ই সজীব রাখা সম্ভব। বিদায়ী ম্যাচের আগে জাতীয় দলের অনুশীলনের কিছু মুহূর্ত কোলাজ করে মেসি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন, যেখানে তিনি লিখেছেন যে এই বিশেষ মুহূর্তগুলোকে তিনি খুব মিস করবেন। শুধু সংবাদমাধ্যমই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডও তো মেসিময় হয়ে আছে গত দু-তিন দিন। খেয়াল করেছেন হয়তো, প্রায় সব ছবিতেই একটা জিনিস কমন।
মেসি মাঠের খেলায় যে অসংখ্য জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, তার মধ্যে তাঁর গোলগুলোর চেয়েও ডিফেন্স চেরা অবিশ্বাস্য সব নিখুঁত পাস অনেক বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাঠ ও মাঠের বাইরে তাঁর নিষ্কলুষ ব্যক্তিত্ব তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের তালিকায় ডিয়েগো ম্যারাডোনা কিংবা পেলের সঙ্গে তাঁর তুলনা অনিবার্যভাবেই চলে আসে।
ম্যারাডোনার সঙ্গে মেসির মিল খুব সামান্যই। ২৮ বছরের ব্যবধানে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে দুজনেরই আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল, আর এখানেই তাঁদের সাদৃশ্যের সমাপ্তি। ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিদায়টি ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর ডোপ টেস্টের জন্য এক নার্সের সঙ্গে মাঠ ছাড়ার সময় কেউ ভাবেনি সেটিই ছিল ম্যারাডোনার শেষ ম্যাচ। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ফক্সবরো স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটির পর সাদা অ্যাপ্রন পরা এক তরুণীর সঙ্গে যখন ডোপ টেস্ট দিতে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কেউই ভাবেননি ম্যারাডোনা আসলে বেরিয়ে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই।
মেসির বিদায়ের গল্পটি বরং পেলের সঙ্গে অনেক বেশি মিলে যায়। ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের তীর্থ মারাকানা স্টেডিয়াম যেভাবে পেলেকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত হয়েছিল, আজ একইভাবে নতুন সাজে সেজেছে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম। সবার ভালোবাসা ও পরম শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে মাঠ ছাড়ছেন লিওনেল মেসি। এটি কেবল একজন কিংবদন্তির প্রস্থান নয়, এটি ফুটবলের এক অনন্য সভ্যতার অবসান।





