২ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপনিবেশবাদ ও রাষ্ট্রকাঠামো: ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়

Published: September 17, 2026, 11:35 am

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমি ও ৭৫ শতাংশ মানুষের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর এই শাসন প্রায় ৬০০ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান ছিল। ১৪১৫ সালে পর্তুগাল কর্তৃক মরক্কো দখলের মধ্য দিয়ে যে ঔপনিবেশিক যুগের সূচনা হয়, তা ১৯৯৯ সালে ম্যাকাও চীনের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এই দীর্ঘ সময়ে কোটি কোটি মানুষ বিদেশি শাসনে শৃঙ্খলিত থেকেছে।

স্পেন ১৪৯৩ সালে হিসপানিওয়ালা (বর্তমান হাইতি ও ডমিনিকান রিপাবলিক) দখলের মাধ্যমে তাদের ঔপনিবেশিক অভিযান শুরু করে, যা ১৮৯৮ সালে কিউবার স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বজায় ছিল। এছাড়া, ব্রিটিশরা ১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়ায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৯৯ সালে হংকং হস্তান্তরের মাধ্যমে তাদের শাসনের ইতি টানে। অন্যদিকে, ওলন্দাজরা ১৬১৯ সালে জাকার্তা দখলের পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় তাদের শাসন বজায় রেখেছিল। এই ঔপনিবেশিক বিস্তার কখনোই কোনো সরল পথে চলেনি, বরং প্রতিটি পদক্ষেপেই তাদের স্থানীয় প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ নিয়াল ক্যাম্পবেল ফার্গুসন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—কীভাবে মাত্র ৯০০ ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ৭০ হাজার সৈন্য দিয়ে ২৫ কোটির বেশি মানুষের বিশাল ভারতবর্ষ শাসন করা সম্ভব হয়েছিল? ফার্গুসনের মতে, এর পেছনে ব্রিটিশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বড় ভূমিকা পালন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ রেল-যোগাযোগ শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থেই ব্যবহার করা হয়নি, বরং বিদ্রোহ দমনে সামরিক কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার জন্যও এটি ব্যবহৃত হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীতে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার সামরিক সদস্য ছিল, যার মধ্যে ৩ হাজার ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ৭৫ হাজার ব্রিটিশ সৈন্য ছিল। যুদ্ধ শেষে এই সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত হয়, যেখানে দরিদ্র ভারতীয় কৃষক ও তাদের সন্তানদের অত্যন্ত নিম্ন বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উপনিবেশিত অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে ঔপনিবেশিক শাসন হুমকির মুখে পড়ে। এর সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বজুড়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দেয়। তবে স্বাধীনতা অর্জনের সাথে সাথেই ঔপনিবেশিক শাসনামলের চিন্তা ও অভ্যাস দূর হয় না, বরং সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমেই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।

ঔপনিবেশিক নিপীড়নের অন্যতম একটি ভয়াবহ উদাহরণ হলো ১৯১৯ সালের জালিনওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার ‘অ্যানর্কিকেল অ্যান্ড রেভ্যুলুশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট’ নামে একটি দমনমূলক আইন পাস করে। এই আইনের প্রতিবাদে পাঞ্জাবে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটে, ১৩ই এপ্রিল অমৃতসরের জালিনওয়ালাবাগে বৈশাখী উৎসব পালনের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার নিরস্ত্র মানুষ জমায়েত হয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিল্যান্ড ডায়ারের নির্দেশে মাত্র দেড়শ গজ দূর থেকে দশ মিনিট ধরে চালানো অবিরাম গুলিবর্ষণে সরকারি হিসেবেই ৩৭৯ জন নিহত এবং হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়।

উপনিবেশবাদ কীভাবে ইতিহাস, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে বিকৃত করেছে এবং এর প্রভাব উপনিবেশোত্তর সমাজগুলোতে এখনো কীভাবে টিকে আছে, তা একটি গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও মননশীল স্বাধীনতার জন্য ঔপনিবেশিক মানসিকতার শিকল ভাঙা অপরিহার্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি-২। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাছাড়া, ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের ভেতর বিশ্বব্যাপী বাজার দখলের প্রতিযোগিতামূলক লড়াইকে কেন্দ্র করে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে, একদিকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে উপনিবেশিত দেশসমূহে কোথাও শুধু জাতীয়তাবাদী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে, উপনিবেশিত দেশগুলো একে একে স্বাধীন হতে থাকে এবং বিংশ শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর প্রায় সকল উপনিবেশিত দেশ ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাধারণভাবে, এই হলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের ৫০০ বছরের উত্থান-পতনের কালপঞ্জি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আমরা যদি ১৪১৫ সালের আগস্ট মাসে পর্তুগাল কর্তৃক উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর উপনিবেশায়নকে পৃথিবীতে ইউরোপীয় উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করি, আর সেই পর্তুগাল কর্তৃক ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ইতিপূর্বে উপনিবেশিত এশিয়ার ম্যাকাও দ্বীপকে চীনের কাছে। 1415, 1999, 600. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডস তার উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া শুরু করে ১৬১৯ সালে, ডাচ্‌ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা শহরের ওপর দখলদারত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, আর এই ডাচ্‌ বা ওলন্দাজদের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ১৯৭৫ সালে, দক্ষিণ আমেরিকার।