
বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গত এক দশকে অভাবনীয় গতিতে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এসব দেশে মোট ৭২৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা ২০১৬ সালের তুলনায় ৯৪ শতাংশ বেশি। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে দেশগুলো থেকে অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ শুধুমাত্র অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ার কারণে নয়, বরং বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিরা আগের চেয়ে বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন।
আইএফএডির তথ্যানুসারে, বর্তমানে প্রায় ২২ কোটি প্রবাসী ও অভিবাসী জনগোষ্ঠী আনুমানিক ১১০ কোটি স্বজনকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে যাচ্ছেন। প্রবাসীরা সাধারণত প্রতিবার ৩০০ থেকে ৪০০ ডলার দেশে পাঠান এবং বছরে গড়ে ৯ থেকে ১০ বার এই লেনদেন সম্পন্ন হয়। ২০২৫ সালে প্রবাসীদের পাঠানো এই মোট অর্থ বৈশ্বিক সরকারি উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণের চেয়ে চার গুণেরও বেশি ছিল। এমনকি একই সময়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেশি ছিল।
লাখ লাখ পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে এই অর্থ মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। হিসাব অনুযায়ী, পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রায় ৭৫ শতাংশই খাবার, বাসস্থান ও ইউটিলিটি বিলের মতো তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে খরচ হয়। বাকি ২৫ শতাংশ অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, সঞ্চয় ও ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ২০২৫ সালে প্রায় ২৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পৌঁছেছে, যা কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখছে।
আইএফএডির ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি ফর রেমিট্যান্সের ব্যবস্থাপক পেদ্রো দে ভাসকনসেলোস জানিয়েছেন, রেমিট্যান্স বিপুল পরিমাণ হলেও এটি সরাসরি পরিবারের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই আসে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, রেমিট্যান্স কোনোভাবেই সরকারি বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা জলবায়ু অর্থায়নের বিকল্প হতে পারে না। বিশেষ করে মধ্য আমেরিকার দেশ হন্ডুরাস, এল সালভাদর ও নিকারাগুয়ায় রেমিট্যান্স দেশটির জিডিপির ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখছে। কোনো কারণে প্রবাসী কর্মীরা দেশে ফিরে এলে এসব দেশের অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
২০২৫ সালে রেমিট্যান্স প্রাপ্তির হারে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল সবচেয়ে দ্রুত এগিয়েছে। সেখানে এক দশকে ১৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মোট রেমিট্যান্স ১৬৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে একক অঞ্চল হিসেবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল তালিকার শীর্ষে রয়েছে। ওই বছর এ অঞ্চলে মোট ৩৮৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা বৈশ্বিক মোটের ৫৩ শতাংশ। এছাড়া আফ্রিকার দেশগুলো ১২৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে, যা গত ১০ বছরের তুলনায় ৮৬ শতাংশ বেশি। এই মহাদেশে নাইজেরিয়াকে সরিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে মিসর।
রেমিট্যান্স লেনদেনের পদ্ধতিতে ডিজিটাল মাধ্যম জনপ্রিয় হলেও এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল সেবার হার ৩৫ শতাংশ। বর্তমানে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমে গড় খরচ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, তবে অ-ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে এই ব্যয় ৭ দশমিক ৩ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। আইএফএডি এই খরচ আরও কমানোর পাশাপাশি লেনদেনে স্বচ্ছতা ও প্রবাসীদের পরিবারের জন্য বিমা ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, বিদেশের শ্রমবাজারের অবস্থা, কর্মসংস্থানে নতুন বিধিনিষেধ বা প্রবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানোর মতো পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। যদিও পেদ্রো দে ভাসকনসেলোসের মতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রয়েছে, কারণ সংকটকালেও প্রবাসীরা তাঁদের পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৫ সালে হন্ডুরাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩০ শতাংশের সমান ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আইএফএডির উদ্ধৃত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গুয়াতেমালায় জরিপে অংশ নেওয়া দেশে ফিরে আসা অভিবাসীদের ৬১ শতাংশই তাঁদের পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে কোনো প্রবাসী বাধ্য হয়ে দেশে ফিরলে তাঁর পরিবারের আয় হঠাৎ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে প্রেরক থেকে গ্রহীতা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালভাবে সম্পন্ন হয় এমন সেবার হার ২০২৫ সালে ছিল ৩৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে প্রবাসীদের ওপর নির্ভরশীল পরিবার ও অর্থনীতিগুলো বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে।





