১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনায় ১২ দিনে সাতটি প্রাণহানি, পাঁচটির পেছনেই মাদকের দ্বন্দ্ব

Published: November 3, 2026, 5:37 pm

খুলনা মহানগর ও জেলাজুড়ে গত ১২ দিনে সাতটি অপরাধমূলক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পাঁচটি ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে মাদক সংক্রান্ত বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। মাদক কেনাবেচা, অর্থ লেনদেন এবং অপরাধী চক্রের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটে। এই ১২ দিনে চারজনকে গুলি চালিয়ে চরম পরিণতি দেওয়া হয় এবং গোলাগুলিতে আরও পাঁচজন আহত হন। পাশাপাশি দুজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আশঙ্কাজনকভাবে জখম করা হয়েছে। হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। খুলনায় ১৭ ঘণ্টার ব্যবধানে যুবদলের দুই নেতাসহ তিনজনকে গুলি।

সর্বশেষ গত সোমবার দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের সিংহের চর সংলগ্ন আঠারোবেকী নদীর চরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই যুবকের অচেত পদচিহ্ন উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহত ব্যক্তিরা হলেন রূপসার রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহর ছেলে মেহেদী হাসান (৩৫) এবং রেজাউল করিম (৩০)। নিহতদের শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। অপরাধ সংঘটনের পর আলামত নিশ্চিহ্ন করতে তাদের সেখানে ফেলে যাওয়া হয় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুমান।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, মাদক ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই দুটি মাদক মামলা ছাড়াও চাঁদাবাজি, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ ছিল। তিনি অতীতে ঘাটের মাঝি ছিলেন। আর রেজাউল করিমও মাদক কারবারে জড়িত ছিলেন এবং সরাসরি সরবরাহের কাজ করতেন।

ওসি আরও জানান, তারা দুজনই স্থানীয় ‘বি কোম্পানি’ নামক একটি অপরাধী চক্রের সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং মাদকের কারবার নিয়ে টানাপোড়েন থেকে এই অপরাধ ঘটে থাকতে পারে। স্বজনেরা মামলা না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং তদন্তভার নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ওই গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মাদক কারবারের বিরোধ এই দুইয়ের জের ধরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে।

এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় মহানগরীর রায়েরমহল এলাকায় নিজের রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয় খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে, যা পরে প্রাণঘাতী রূপ নেয়। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্দ্য বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি ১৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরাফাত হোসেন, যাকে ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সিদ্দিক শেখকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রেফ্রিজারেটরের কিস্তির টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এই ঘটনা ঘটলেও অন্য কোনো শত্রুতা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আরাফাতকে দলীয় পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে ছাত্রদল।

গত শনিবার রাত ১১টার দিকে সোনাডাঙ্গা এলাকার লবণচরা দরগা কাশেমিয়া মসজিদসংলগ্ন সড়ক থেকে শহীদুল ইসলাম (৩৫) নামের এক স্থানীয় যুবকের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দিন বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর রাতে নিজ বাসার কাছেই তার ওপর হামলা হয়। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম জানান, শহীদুল মাদক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে একটি পুরোনো মামলাও ছিল। শহীদুলের মা বাদী হয়ে থানায় যে মামলাটি করেছেন, সেখানেও মাদক নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ জানায়, দু-তিন দিন পরপর বাড়িতে আসতেন শহীদুল। পরে রাত ১১টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে সড়কের ওপর তাঁর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন।

গত ২২ অক্টোবর খুলনা নগরে ঘটে আরও দুটি পৃথক অপরাধের ঘটনা। ওই দিন সকালে তাওহিদুল ইসলাম নামের এক তরুণ এবং সন্ধ্যায় খুশি আক্তার নামের এক নারী চরম সহিংসতার শিকার হন। পুলিশের তদন্তকারী সূত্রের খবর, তাওহিদুল ‘পলাশ গ্রুপ’ নামের একটি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যাদের সঙ্গে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর পরিচালিত ‘বি কোম্পানি’র প্রত্যক্ষ বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে নিহত খুশি আক্তার গ্রেনেড বাবু চক্রের হয়ে মাদক বিপণনে যুক্ত ছিলেন বলে তথ্য রয়েছে।

তাওহিদুলের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে, যেখানে ‘বি কোম্পানি’র সদস্য শহিদুল ইসলাম ওরফে সেজান, সাকিবুর রহমান ওরফে জিতু ও রাব্বি চৌধুরীর নাম এসেছে। আর খুশি আক্তারের ঘটনায় তার বোন হাসি আক্তার বাদী হয়ে চিহ্নিত অপরাধী আশিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, এসব ঘটনার পেছনে থাকা জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

এদিকে ২৫ অক্টোবর সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় বকেয়া বাসা ভাড়া নিয়ে বিতণ্ডার একপর্যায়ে বাড়িওয়ালার কাঠের আঘাতে রকিবুল ইসলাম (২৪) নামের এক ভাড়াটিয়ার জীবনাবসান ঘটে। ওই ঘটনায় রকিবুলের স্ত্রী মামলা করার পর অভিযুক্ত বাড়িওয়ালা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) ও জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চলতি বছরের ২ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে নগর এলাকায় ৩৭টি মামলায় ৩৯ জনের জীবনহানি হয়েছে। যেখানে আগের বছরগুলোতে নগর এলাকায় মামলার সংখ্যা ছিল ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি। খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ১০ মাসে ৭১ খুন, পেছনের কারণ কী।

একইভাবে জেলা পুলিশ আওতাধীন এলাকাতেও অপরাধের পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বমুখী। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল। আর চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৩৭টি অপরাধের ঘটনায় ৩৫টি মামলা রুজু হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় অন্তত ৩৫টি প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেগুলোতে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার দেখা গেছে।