
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার খুচরা বাজারে সারের তীব্র সংকটে কৃষকরা যখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন, ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে নৌপথে মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে সরকারি সার। মাঝেমধ্যে কোস্টগার্ড ও পুলিশের অভিযানে সারের কিছু চালান আটক করা সম্ভব হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণের তুলনায় এই আটকের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। অসাধু ডিলার ও চোরাকারবারিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে বেশি দাম দিয়েও স্থানীয় কৃষকরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, যার ফলে সামগ্রিক কৃষি খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চরফ্যাশন পৌরসভাসহ মোট ২২টি ইউনিয়নে সর্বমোট ২২ জন নিবন্ধিত ডিলার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সরকারি ডেলিভারি অর্ডার বা ডিও লেটারের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রত্যেক ডিলারের অনুকূলে ২২ টন করে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং ডিএপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এই সার ডিলারদের পাইকারি ও খুচরা বাজারে নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের নিকট বিক্রি করার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটছে ভিন্ন চিত্র। তারা হলেন- নোয়াখালীর সিরাজ (৬০), সোহেল (৩২) ও শাহারাজ (৪৩) এবং চরফ্যাশনের পারভেজ (৪০)। এর মধ্যে ১০০ বস্তা ইউরিয়া, ৪০ বস্তা ডিএপি, ১৫ বস্তা টিএসপি এবং ২০ বস্তা এমওপি সার ছিল। সেগুলো চর কুকরিমুকরি এলাকার কৃষকদের জন্য নেওয়া হচ্ছিল।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে মূল কারসাজিটি পরিচালিত হচ্ছে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়নগুলোতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ডিলার জানান, মূল ভূখণ্ডের তুলনায় দ্বীপ এলাকার ইউনিয়নগুলোতে কৃষকের সংখ্যা ও চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম। কিন্তু নিয়মের মারপ্যাচে সেসব এলাকার ডিলাররাও প্রতি মাসে সমপরিমাণ অর্থাৎ ২২ টন সার বরাদ্দ পাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে সারের চাহিদা কম থাকায় অসাধু ডিলাররা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাস শেষে উদ্বৃত্ত সার বাজারে বিক্রি না করে অধিক মুনাফার লোভে সরাসরি চোরাকারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ও কৃষকদের জোরালো অভিযোগ, ডিলাররা প্রথমে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন এবং পরে সাধারণ কৃষকদের কাছে চড়া দামে সার বিক্রি করেন। আর উদ্বৃত্ত বড় অংশটি গোপনে চলে যায় চোরাকারবারিদের কাছে। পরে এই চক্র গভীর রাতে ট্রলারে করে নদী ও সমুদ্রপথে সরাসরি মিয়ানমারে সার পাচার করে। ক্ষুব্ধ কৃষকদের মতে, ডিলাররা যদি এই সার স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করতেন, তবে কিছুটা চড়া দামে হলেও কৃষকরা তা পেতেন; কিন্তু সরাসরি দেশ থেকে সার বাইরে চলে যাওয়ায় এখন হাহাকার তৈরি হয়েছে।
সার পাচারের এসব গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চর কুকরিমুকরির ডিলার ও মেসার্স জাকির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. জাকির হোসেন। তার দাবি, সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই কৃষকদের কাছে সার বিতরণ করা হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কোনো ধরনের কালোবাজারির সম্পৃক্ততা নেই। এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্বীপ ইউনিয়নগুলোতে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করার পাশাপাশি উপকূলীয় নৌপথগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল অবিলম্বে জোরদার করা দরকার। সারের কালোবাজারি বা চোরাই পথে বিক্রির মতো কোনো অপকর্মের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। লোকমান হোসেন তখন সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, বিসিআইসির সার ডিলার মেসার্স জিসান ট্রেডার্সের মালিক জাহিদ হাসানের কাছ থেকে খুচরা ডিলার মালেক গাজী সার সংগ্রহ করেছিলেন। এসব সার কোথা থেকে আসছে, তা নির্ণয় করতে পারেননি।
অভিযান ও জব্দকৃত চালান
সাম্প্রতিক সময়ে কোস্টগার্ড ও পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে বেশ কিছু বড় চালান জব্দ করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে দক্ষিণ আইচা থানার তেঁতুলিয়া নদী থেকে ৪৯২ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্টগার্ডের চরমনিকা দক্ষিণ জোনের সদস্যরা। এ সময় মোট আটজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন
- নোয়াখালীর আজগর হোসেন ও সেলিম মিয়া
- লক্ষ্মীপুরের কবির হোসেন
- ভোলার আব্দুল মমিন
- চরফ্যাশনের মো. শামীম ও মো. ইউসুফ
- দুলারহাট থানার মো. সিরাজ
- দৌলতখানের মো. রায়হান
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে গত ১২ আগস্ট আসলামপুর ইউনিয়নের বেতুয়া নতুন ফিশারি ঘাট এলাকা থেকে ২৯৩ বস্তা সারসহ একটি ট্রাক ও ফিশিং বোট জব্দ করে পুলিশ। সে সময় আটক চারজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আসামিরা হলেন এর আগে গত ১২ আগস্ট উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেতুয়া নতুন ফিশারি ঘাট এলাকা থেকে ২৯৩ বস্তা সার জব্দ করে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ তেমন তথ্য দিতে পারেনি।
- ও শাহারাজ
- এবং চরফ্যাশনের পারভেজ
- মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
বেতুয়া এলাকার এক স্থানীয় মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই নৌপথ ব্যবহার করে আসছে। তারা সার পাচারের পাশাপাশি ফেরার পথে ট্রলারে করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের চালান নিয়ে আসে। এছাড়া ২৩ আগস্ট চর কচ্ছপিয়া ঘাটে ১৭৫ বস্তা সারসহ ট্রলার আটকের ঘটনা ঘটলেও পরবর্তীতে ভুল তথ্যের অজুহাতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হোসেনের উপস্থিতিতে লিখিত অঙ্গীকারনামা নিয়ে তা ছেড়ে দেওয়া হয়। চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, সার পাচারে ব্যবহৃত ট্রলার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে চো라চালানের মূল উৎস উদঘাটন নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল ২৩ আগস্ট।





