৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদের পার্থক্য বোঝা জরুরি

Published: September 23, 2026, 3:57 pm

দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ ছাত্রসংগঠন কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়াতলে পরিচালিত হয়। নামমাত্র ছাত্ররাজনীতির আড়ালে এসব সংগঠন মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থের চেয়ে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি ব্যস্ত। এর ফলে উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রায়ই ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও ক্যাম্পাসগুলোতে সহনশীল পরিবেশের বদলে পারস্পরিক সংঘাতের চিত্রই বেশি প্রকট, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত শতকের আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে ভয়াবহ সহিংসতায় জড়িয়েছিল। সে সময় আবাসিক হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে লাঠিসোঁটা থেকে শুরু করে পিস্তল ও শটগানের ব্যবহার নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। এসব সংঘাতের কারণে সেশনজটের কবলে পড়েছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম। পরবর্তী সময়গুলোতেও যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, তাদের অনুগত ছাত্রসংগঠনগুলো একইভাবে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই পারস্পরিক সংঘর্ষের বলি হতে হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের, যারা রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থেকেও রাজনীতির শিকার হয়েছেন।

বর্তমান ছাত্ররাজনীতির বড় একটি অংশ এখন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং আবাসিক হল দখলের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত। এমনকি শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের মতো প্রশাসনিক বিষয়েও ছাত্রনেতাদের হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলো প্রায়ই নিয়মবহির্ভূত কাজের ক্ষেত্রে এক ধরনের সুরক্ষা পেয়ে থাকে। যারা নিয়মিত ছাত্ররাজনীতির পক্ষে যুক্তি দেন, তারা নিশ্চয় এই সহিংসতা ও পেশিশক্তির প্রদর্শনকে সমর্থন করেন না।

রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই সংগঠনগুলো শেষ পর্যন্ত উদ্ধত হয়ে ওঠে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালাতে দ্বিধা করে না। দলীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত করার পরিবর্তে এসব সংগঠন ক্যাম্পাসে বিভেদ ও প্রতিহিংসার বীজ বপন করছে। জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ ছাত্রনেতা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন দেয়াল তৈরি করেছে যে, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করাই এখন যেন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক-রাজনীতিও এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করছে, যেখানে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ছাত্রনেতাদের সামনে অসহায় বোধ করেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বহুবার এই দমনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেও স্থায়ী কোনো প্রতিকার পাননি। এর পেছনে মূল কারণ হলো জাতীয় রাজনীতির উচ্চপর্যায় থেকে এসব ছাত্রসংগঠনকে রাজনৈতিক স্বার্থে জিইয়ে রাখা। তবে ছাত্রদের অধিকার আদায়ে বা শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির প্রয়োজন নেই। এর পরিবর্তে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চাকে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। ছাত্র সংসদ সক্রিয় থাকলে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর জোরালো হতো এবং রাজনৈতিক দলের অনুগত না হয়েও তারা নিজেদের দাবি আদায়ে সোচ্চার হতে পারত।

রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ছাত্রসংগঠন ব্যবহারের যে কৌশল অবলম্বন করে, তা আসলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। জনপ্রিয় সরকার গড়ার পথ হলো উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন, ছাত্রসংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে সরাসরি ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া নিরুৎসাহিত করা এবং সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া। এর ফলে তরুণরা শিক্ষাজীবন শেষে পরিপক্ক অবস্থায় মূলধারার রাজনীতিতে আসার সুযোগ পাবে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা জাতীয় দুর্যোগে বা সংকটময় সময়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে কাজ করতে পারবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুরের মতে, ছাত্ররাজনীতি আর ছাত্রসংগঠনভিত্তিক রাজনীতি এক নয়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, ছাত্র সংসদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনীতিই শিক্ষার্থীদের জন্য কাম্য। সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার পথ সুগম করতে হলে লেজুড়বৃত্তি মুক্ত ছাত্র রাজনীতির বিকল্প নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এগুলোর প্রায় প্রতিটি কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত কিংবা সমর্থনপুষ্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এসব ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি ও কর্মসূচি খুব কম ক্ষেত্রেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বলে; বাস্তবে তাদের কর্মকাণ্ড উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশকেই নষ্ট করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব ছাত্রসংগঠনের প্রয়োজন কতটা আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখনকার সেশনজটের পেছনে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাতই দায়ী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও ছাত্ররাজনীতি মানে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা আর নিজেদের মধ্যে মারামারি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত কয়েক দশকে ছাত্রসংগঠনগুলো চাঁদাবাজি, টেন্ডার দখল থেকে শুরু করে আবাসিক হল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিভিন্ন আপত্তিকর ও নীতিবিরুদ্ধ কাজ করে যাচ্ছে।