১৭ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যালন ডি’অর: সাত দশকের স্বর্ণালি ট্রফির রোমাঞ্চকর ইতিহাস

Published: November 2, 2026, 12:36 am

ফুটবলারদের কাছে ব্যালন ডি’অর কেবল একটি সোনালি বলের ট্রফি নয়, বরং স্বপ্নের চূড়ান্ত সাফল্যের প্রতিফলন। মাঠের গোলসংখ্যা, অর্জিত ট্রফি এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ভিড়ে যে সম্মান একজন খেলোয়াড়কে অনন্য উচ্চতায় আসীন করে, তার নাম ব্যালন ডি’অর। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের ফুটবল সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ইউরোপের সেরা ফুটবলারকে সম্মানিত করার লক্ষ্যে এই পুরস্কারের যাত্রা শুরু করে। প্রথমবার এই সম্মান অর্জন করেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউস, তখন তার বয়স ছিল ৪১ বছর। সময়ের আবর্তে এটি এখন বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অথচ এই পুরস্কারের শুরুটা হয়েছিল বেশ ছোট পরিসরে। সেই ছোট্ট আয়োজন আজ পরিণত হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতিগুলোর একটিতে। প্রজন্ম বদলাবে, নতুন তারকা আসবেন, কিন্তু সোনালি বল হাতে তোলার স্বপ্ন ফুটবলারের কাছে থেকে যাবে চিরকাল।

শুরুর দিকে এই পুরস্কারটি কেবল ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল, যার ফলে পেলে কিংবা ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরা ইউরোপের ক্লাবে খেললেও পুরস্কারটির জন্য বিবেচিত হননি। ১৯৯৫ সালে নিয়ম সংশোধন করে ইউরোপের লিগে খেলা সব দেশের ফুটবলারদের জন্য পথ উন্মুক্ত করা হয়। ওই বছর প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ ব্যালন ডি’অর জেতেন। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে যোগ্যতার পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়, যাতে বিশ্বের যেকোনো লিগের ফুটবলাররা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন। অর্থাৎ শুধু গোল কিংবা শিরোপা জিতলেই ব্যালন ডি’অর নিশ্চিত হয় না।

পুরস্কারের কাঠামোতে একাধিক পরিবর্তন এসেছে দীর্ঘ পথচলায়। ২০১০ সালে ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ও ফিফা যৌথভাবে ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’ নামে পুরস্কার প্রদান শুরু করে, যা ছয় বছর পর আবার আলাদা হয়ে যায়। ফিফা প্রবর্তন করে ‘দ্য বেস্ট’ স্বীকৃতি। এরপর ২০২৪ সাল থেকে ব্যালন ডি’অর আয়োজনে ফ্রান্স ফুটবলের সাথে সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয় উয়েফা। বর্তমানে বিজয়ীদের নির্ধারণ করা হয় সাংবাদিকদের ভোটে। পুরুষ বিভাগে ফিফা র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০০ এবং নারী বিভাগে শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকরা তাদের পছন্দের তালিকা প্রদান করেন। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, মাঠে প্রভাব, দলীয় সাফল্য এবং আচরণ—এই মানদণ্ডগুলোই মূল্যায়নের কেন্দ্রে থাকে। ফ্রান্স ফুটবলের সম্পাদকীয় দল প্রথমে ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এরপর ভোটাররা সেখান থেকে নিজেদের পছন্দের সেরা ১০ জনকে বেছে নেন। প্রথম পছন্দের জন্য বরাদ্দ ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় পছন্দে ১২, তৃতীয়তে ১০। এরপর যথাক্রমে ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ ও ১ পয়েন্ট দেওয়া হয়। সব ভোটের পয়েন্ট যোগ করে নির্ধারিত হয় বিজয়ী। পয়েন্ট সমান হলে প্রথম স্থানে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া খেলোয়াড় এগিয়ে থাকেন।

ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে লিওনেল মেসির আধিপত্য অনস্বীকার্য, তিনি রেকর্ড আটবার এই পুরস্কার জিতেছেন। ২০০৯ সালে প্রথমবার জয়ের পর ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে টানা চারবার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখেন তিনি। এরপর ২০১৫, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩ সালেও মেসিই এই পুরস্কার লাভ করেন। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন পাঁচবার বিজয়ী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এছাড়া ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি ও মার্কো ফন বাস্তেন তিনবার করে এই সম্মাননা পেয়েছেন।

২০২৬ সালে ব্যালন ডি’অরের মর্যাদাপূর্ণ এই ট্রফিটি প্রথমবার হাতে তুলেছেন ইংল্যান্ডের তারকা ফুটবলার হ্যারি কেইন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছেন যথাক্রমে কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লামিন ইয়ামাল। একই আয়োজনে কোপা ট্রফি, ইয়াশিন ট্রফি ও গের্ড মুলার ট্রফির মতো অন্যান্য পুরস্কারও প্রদান করা হয়েছে।

নারীদের ফুটবলে ব্যালন ডি’অর যাত্রা শুরু করে ২০১৮ সালে। প্রথমবার পুরস্কারটি জেতেন নরওয়ের আডা হেগারবার্গ। এরপর আলেক্সিয়া পুতেয়াস ও আইতানা বোনমাতি একাধিকবার এই সম্মাননা নিজেদের নামে করেছেন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে নারীদের বিভাগে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী হয়েছেন আলেক্সিয়া পুতেয়াস। বিতর্ক কিংবা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও ব্যালন ডি’অর তার আবেদনের জায়গাটি অটুট রেখেছে। ১৯৫৬ সালের সেই ছোট পরিসরের উদ্যোগ আজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ফুটবলারদের শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রেরণা যোগাচ্ছে।