২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরতের নীল আকাশে কাশফুলের দোল ও ঢাকের ডাক

Published: October 14, 2026, 5:01 pm

শরৎকাল মানেই যেন প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্য। আকাশজুড়ে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘের বিচরণ আর নদীপাড়ের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে কাশফুলের শুভ্রতার ছোঁয়া জানান দেয় ঋতু পরিবর্তনের। কবি শামসুর রাহমান তার কাব্যময় ভাষায় কাশফুলকে নিজের শুভ্রকেশরাশির রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘এই পরিণতি জেনেও এখনো বেহায়া মাথায় এক রাশ শাদা কাশফুল নিয়ে কখনো সকালে দুপুরে অথবা গভীর নিশীথে কলম চালাই।’ এ যেন বার্ধক্য আর প্রকৃতির শুভ্রতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। কোথায় যায়, কত দূরে যায়, অপলক দৃষ্টি তা অবলোকন করত গভীর উচ্ছলতায়।

আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে কাশফুল আর বিকেল একাকার হয়ে মিশে থাকে। বন্ধুদের সাথে কাশফুলের ঝোপে লুকোচুরি খেলা কিংবা বাতাসের দোলায় দুলতে থাকা কাশফুলের সাথে পাল্লা দিয়ে ছোটাছুটি ছিল এক দারুণ আনন্দ। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় কাশফুল একটি ঘাসজাতীয় জলজ উদ্ভিদ, যার বৈজ্ঞানিক নাম স্যাকারাম স্পনটেনিয়াম (Saccharum spontaneum)। এটি সাধারণত উচ্চতায় প্রায় তিন মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। শরতের এই অনন্য রূপ শুধু চোখ জুড়ায় না, বরং হৃদয়ে এক প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। আকাশ নেমেছে ওই পাড়ে শরতের মেঘে চড়ে বাতাস থেমেছে নদীপাড়ে কাশফুলে নড়েচড়ে। বিকেলে বন্ধুদের মাঝে অন্য রকম একটা খেলা ছিল—কাশফুল খেলা। গুচ্ছ কাশফুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসা একাকী কোনো ফুল নিয়ে সেই প্রতিযোগিতা। উড়ে আসা কাশফুলটাকে বন্ধুদের মধ্যে কে বেশি ফুঁ দিয়ে উপরে তুলতে পারে, মাটিতে কিংবা কোনো ডালে বসার আগে কতক্ষণ হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখতে পারে—এটাই ছিল মূল আকর্ষণ। ফুঁ দিতে দিতে গাল ব্যথা হয়ে যেত, পা ব্যথা করত, চোখ ঝাপসা হয়ে আসত—তবু খেলায় কোনো বিরতি ছিল না; ছিল কেবলই জেতার চেষ্টা।

শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা বয়ে আসে এই কাশফুলের হাত ধরেই। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের সাথে কাশফুলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। নীল আকাশে সাদা মেঘের সাথে কাশফুলের দোল আর মণ্ডপ থেকে ভেসে আসা ঢাকের কাঠি যেন একই সূত্রে গাঁথা। প্রতিটি ঢাকের শব্দ আর বাতাসের মৃদু দোলায় শরতের এই শুভ্রতা জানান দেয় মা আসছেন। প্রকৃতি ও মানুষের উৎসবের এই একাত্মতা হাজার বছরের বাংলার সংস্কৃতির এক অমোঘ বৈশিষ্ট্য।