১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোলমেট খুঁজতে জেন-জি এখন ভরসা রাখছে জাদুমন্ত্র ও ট্যারোতে

Published: November 1, 2026, 8:41 pm

বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা, বিশেষ করে জেন-জিরা প্রেমের ক্ষেত্রে নতুন এক ধারার দিকে ঝুঁকছেন। সম্পর্কের জটিলতা আর অনিশ্চয়তা কাটাতে অনেকে এখন আর কেবল মানুষের ওপর ভরসা করছেন না; আশ্রয় নিচ্ছেন ম্যানিফেস্টেশন, ট্যারো কার্ড কিংবা ভালোবাসার জাদুমন্ত্রের মতো আধ্যাত্মিক চর্চার। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার যুগে প্রেম নিয়ে এই অদ্ভুত আগ্রহ কেন বাড়ছে, তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। প্রেমের ক্ষেত্রে কেউ কেমন জীবনসঙ্গী চান, সম্পর্কের মধ্যে কী ধরনের অনুভূতি ও বোঝাপড়া আশা করেন, সেসব লিখে রাখেন। এতে নিজের কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটি বাস্তবে তৈরি হয়েছে, এমনভাবে মনের ভাবনা লিখে রাখেন অনেকে। ডেটিং অ্যাপে হতাশা, জাদুবিদ্যায় বাড়তি আগ্রহ। কিন্তু মনের কথা বোঝা কিংবা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ হয়নি। পছন্দের মানুষটি ফিরবেন কি না, নতুন কেউ জীবনে আসবেন কি না কিংবা চলমান সম্পর্কটি টিকবে কি না। তাঁর গবেষণা বলছে, শুধু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্নে ডুবে থাকলে লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা কমে যেতে পারে। প্রেমের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেমন সঙ্গী চান, তা জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের প্রত্যাশা স্পষ্ট করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে খোলামেলা যোগাযোগও জরুরি। সব মিলিয়ে, সোলমেট খোঁজার এই নতুন প্রবণতা আসলে ভালোবাসার অনিশ্চয়তার মধ্যে একটু ভরসা ও মানসিক স্বস্তি খোঁজারই আরেকটি প্রকাশভঙ্গি মাত্র।

প্রেম নিয়ে জেন-জির নতুন চর্চা

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেটিং নিউজ (DatingNews) সম্প্রতি ১,০১৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। এতে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া জেন-জিদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ জানিয়েছেন, মনের মানুষ খুঁজে পেতে বা সম্পর্ক টেকসই করতে তাঁরা জীবনে অন্তত একবার হলেও আধ্যাত্মিক, সাইকিক বা জাদুবিদ্যার মতো পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেটিং নিউজ (DatingNews)-এর ১ হাজার ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা একটি জরিপে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য।

  • ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং: ২৯ শতাংশ জেন-জি এটি নিয়মিত চর্চা করেন।
  • সাইকিক পরামর্শ: ২৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী কোনো সাইকিকের শরণাপন্ন হয়েছেন।
  • ট্যারো কার্ড রিডিং: ১৭ শতাংশ মানুষ প্রেমের ভবিষ্যৎ জানতে ট্যারো কার্ড ব্যবহার করেন।
  • অ্যাস্ট্রোলজি বা রাশিচক্র: ১৬ শতাংশ সম্পর্ক বিচারের জন্য রাশিফল ও গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর নির্ভর করেছেন।
  • অর্থব্যয়: ১৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে লাভ স্পেল বা বিশেষ রিচুয়ালের জন্য অর্থ ব্যয় করেছেন।

যদিও এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট, তবুও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই ধরনের চর্চার ব্যাপক প্রসার তরুণ প্রজন্মের প্রেম নিয়ে নতুন ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার একটি পরিচিত ধরন স্ক্রিপ্টিং। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকদের ২০১৬ সালের একটি গবেষণাও প্রাসঙ্গিক।

কেন মানুষ জাদুবিদ্যার দিকে ঝুঁকছে?

আধুনিক ডেটিং অ্যাপের যুগে যোগাযোগের সুযোগ বাড়লেও সম্পর্কের স্থায়িত্ব কমেছে।

মেসেজের উত্তর না পাওয়া, সম্পর্কের স্পষ্ট সংজ্ঞার অভাব কিংবা হুট করে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনায় তরুণরা এক ধরনের মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন।

এই অনিশ্চয়তা থেকে রেহাই পেতে তারা ট্যারো বা ম্যানিফেস্টেশনের মতো প্রতীকী উপায়ের মাধ্যমে একটু মানসিক আশ্বাস খুঁজছেন।

মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, প্রিয়জন হারানো কিংবা কঠিন সময়ে এই জাতীয় রিচুয়াল মানুষের শোক কমাতে এবং পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার অনুভূতি দিতে সাহায্য করে।

তবে এগুলো কারো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে না।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ ও গবেষণাপত্র

বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণায় এসব চর্চার নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিকগুলো উঠে এসেছে। নিচে প্রাসঙ্গিক গবেষণার তথ্যগুলো দেওয়া হলো নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ও জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলে ওটিঙ্গেনের গবেষণায় ইতিবাচক কল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

  • DatingNews, ৬ অক্টোবর ২০২৬: ১,০১৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা জরিপটি জেন-জির প্রেমসংক্রান্ত আধ্যাত্মিক চর্চার প্রবণতা তুলে ধরে।
  • Harvard Business School (২০১৪): মাইকেল আই. নর্টন ও ফ্রান্সেসকা জিনোর মতে, রিচুয়াল পালন শোক ও মানসিক কষ্ট কমাতে কার্যকর।
  • Harvard ও UC Berkeley (২০১৬): নির্দিষ্ট কিছু আচার উদ্বেগ কমাতে এবং প্রথম ডেটের মতো পরিস্থিতিতে চাপ সামলাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
  • Gabriele Oettingen (২০১৬): কেবল ইতিবাচক কল্পনার চেয়ে বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা লক্ষ্য অর্জনে বেশি কার্যকর।
  • Pew Research Center (২০২৫): ৯,৫৯৩ জনের ওপর করা জরিপে দেখা যায়, বেশিরভাগ মানুষ মূলত বিনোদনের অংশ হিসেবেই জ্যোতিষশাস্ত্র বা ট্যারোর চর্চা করেন।

বাস্তবতা বনাম কল্পনা

জরিপ অনুযায়ী, যেসব জেন-জি এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করেছেন, তাদের ৪৬ শতাংশ দাবি করেছেন যে তারা এর মাধ্যমে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন। তবে এটি একান্তই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কোনো জাদুমন্ত্র বা ট্যারো রিডিংয়ের কারণে সম্পর্ক ভালো হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো একটি ঘটনার সাথে রিচুয়ালের সময় মিলে গেলে মানুষ সেটিকে কার্যকারণ বলে ধরে নেন। অন্যদিকে ২৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল আংশিক সফলতার। তবে এটি লাভ স্পেল দিয়ে কাউকে প্রেমে ফেলা সম্ভব, এমন কোনো প্রমাণ নয়। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ দৈনিক রাশিফল, ১০ শতাংশ সাইকিক বা ট্যারো রিডারের পরামর্শ এবং ৮ শতাংশ লাভ স্পেলের ওপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছেন।

সবশেষে, মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাদার পরামর্শের ওপর জেন-জিদের আস্থাও কিন্তু কমেনি। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক চর্চার প্রতি আগ্রহ থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাদার পরামর্শের গুরুত্ব তাঁদের কাছে এখনো রয়েছে।

উক্ত জরিপে ৩৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী জানিয়েছেন, সম্পর্কের জটিলতায় তারা পেশাদার থেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের ওপরই সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখেন। তাই আধুনিক জেন-জিরা ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে জাদুবিদ্যার চেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়ের দিকেই বেশি আগ্রহী। একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য পারস্পরিক সম্মতি, বিশ্বাস এবং খোলামেলা যোগাযোগই যে মূল চাবিকাঠি, তা এই প্রজন্ম বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। শুধু স্বপ্ন দেখলেই কি মিলবে ভালোবাসা।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • Harvard Business School, ২০১৪: Michael I. Norton ও Francesca Gino-এর Rituals Alleviate Grieving for Loved Ones, Lovers, and Lotteries গবেষণা। PubMed+1।
  • Harvard ও UC Berkeley-এর গবেষক দল, ২০১৬: Don”t Stop Believing: Rituals Improve Performance by Decreasing Anxiety। faculty.haas.berkeley.edu।
  • Gabriele Oettingen, ২০১৬: The Power of Prospection: Mental Contrasting and Behavior Change। Wiley Online Library।