
আজ পৃথিবীর মন খারাপ। আকাশে–বাতাসে যেন সেই মন খারাপেরই কলরব। মানুষে-মানুষে কত ভেদাভেদ, ভাষা বা মানচিত্রের ভিন্নতা থাকলেও আজ সবার মন খারাপের কারণ একই—লিওনেল মেসি বিদায় নিলেন। একজন ফুটবলারের বিদায়ে পৃথিবীর এত মানুষের আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার ঘটনা বোধ হয় খুব বেশি নেই।
ফুটবলের কবির পায়ের জাদু
মেসি আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছেন। তাঁর পায়ের জাদুতে কারও কৈশোর জড়িয়ে আছে, কারও তারুণ্য। বার্সেলোনার মেসিকে দেখার মধ্যে এক অনন্য বিস্ময় ছিল; বল পায়ে গেলেই দর্শক নিশ্চিত থাকত যে কিছু একটা ঘটবেই। আমার কাছে তিনি ফুটবলের কবি। কী অসম্ভব, ভয়ংকর সুন্দর তাঁর খেলার কৌশল। তাঁর বাঁ পায়ে বল থাকলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররাও অসহায় হয়ে পড়ত। গোলের সৌন্দর্য ছাপিয়ে কখনো কখনো তাঁর একটি পাসও শিল্পের মতো মনে হতো। আবার কারও জীবনের সবচেয়ে আনন্দের রাত হয়তো তাঁর কোনো একটি ম্যাচের রাত। একইভাবে তাঁর কোনো হারের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে মন খারাপ, হইচই, তর্কবিতর্ক। এমন একটা সকাল আসবে, যেদিন মেসির বিদায়ের কথা লিখতে বসে পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়বে। তাঁর খেলা দেখলে মনেই হতো না, ফুটবল কঠিন কোনো খেলা।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে চড়াই-উতরাই ও পূর্ণতা
- ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার সেই জয় এবং মেসির মুখের হাসি আজও অমলিন। বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছিল সেদিন।
- ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কথা মনে করলে এখনো বুকের ভেতর অন্য রকম এক অনুভূতি হয়। সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু হলেও প্রতিটি ম্যাচ ছিল মেসির জীবনের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
- ফাইনালের আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স ম্যাচটি ছিল নাটকীয়তার চূড়ান্ত পর্যায়। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে মেসির হাতে উঠল স্বপ্নের বিশ্বকাপ—তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাটি পূর্ণ হলো।
বিদায়বেলার সেই অমোঘ সত্য
আজ রূপকথার গল্পের সেই নায়কই ফুটবলকে বিদায় জানালেন। ম্যাচ শুরুর আগে আর মনে হবে না, মেসি কী করবেন? বলটা তাঁর পায়ে গেলে যে অদ্ভুত প্রত্যাশা তৈরি হতো, সেটা আর হবে না। মেসি তাঁর বিদায়ী বক্তব্যে বলেছেন, ‘মন চায় আজীবন এখানেই থেকে যাই, তবে আমার মনে হচ্ছে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়।’ ঘুম চোখে সকালে উঠে বন্ধুর সঙ্গে আগের রাতের ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করেছি।
বাস্তবতা হলো, সময়কে ধরে রাখা যায় না। কবির কলম বা শিল্পীর সুরের মতো খেলোয়াড়কেও একসময় জার্সি খুলে রাখতে হয়। মেসিও রাখলেন। কিন্তু মাঠের লড়াই আর আবেগের যে স্মৃতি তিনি রেখে গেলেন, তাতে মেসি কোনোদিন হারিয়ে যাবেন না। তিনি থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, নিভৃতে, নীরবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—’যেতে নাহি দিব। যত বার পরাজয়, তত বার কহে, আমি ভালোবাসি যারে, সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে?’ মনেই হয়নি তখন, একদিন এগুলো স্মৃতি হয়ে যাবে। বলতে ইচ্ছে করবে, ‘যেতে আমি দিব না তোমায়।’।





