
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি ইরানে নতুন করে কোনো সামরিক হামলা চালায়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের তেল স্থাপনা, সমুদ্রতলের যোগাযোগ ক্যাবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত করা হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসিন রেজায়ি। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরান তার অর্থনৈতিক জীবনরেখায় হামলার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে এমন অবকাঠামোকেও ছাড় দেবে না, যা শত্রুপক্ষকে সহযোগিতা করছে। আমাদের কৌশল হলো, কোনো সীমারেখা না মানা।’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলার জবাবে ইরান এ ধরনের অভিযান চালানোর কতটা সক্ষমতা রাখে এবং চীন বা রাশিয়ার কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক কোনো সহায়তা পায় কি না, তা যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখায় হামলা চালানো হবে, অথচ এসব হামলা চালাতে সহায়তাকারী অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে নিরাপদ ও হামলার আওতামুক্ত রাখা হবে—এমন কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না।’। সোমবারের বৈঠকে তিনি হেগসেথকে এ মনোভাবের কথা জানিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ হামলা নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনায় কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মদি দাবি করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নীতিগতভাবে নতুন করে হামলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। আলোচনায় আগের কিছু প্রস্তাব নতুনভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ইরান এই পরিস্থিতিকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে এবং সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর ও সময়সীমার প্রচলিত সীমা ভেঙে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা পরবর্তী সংঘাতকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছি। আর ট্রাম্প এমন এক সংকটে আটকে পড়বেন, যা তার প্রেসিডেন্সির বাকি সময়কে গ্রাস করবে এবং পরবর্তী প্রশাসনের জন্য ধ্বংসস্তূপ রেখে যাবে।’।
শত্রুপক্ষ যতটা ধারণা করছে, যুদ্ধ তার চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলার জন্য একটি বিস্তারিত লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যেই সোমবার ইসরাইলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে বৈঠক করেছেন নেতানিয়াহু। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু এই আলোচনার সময় তার এই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন যে, ইরান আগে হামলা করুক। এদিকে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় মধ্যপ্রাচ্যে আগামী নভেম্বরের মধ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, যুদ্ধবিমান এবং কয়েক হাজার বিশেষ বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে। ইরাকের আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড্ডয়নসহ বিভিন্ন অভিযানের অনুশীলনও চলছে।
চলমান এই উত্তেজনার মাঝে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ দশমিক ৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ রেজা নাসরি সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধের তৃতীয় ধাপ শুরু হলে তা নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি বলেন, পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি শোধনাগার এবং বন্দরগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের মন্দার মুখে ঠেলে দেবে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে। কোটি কোটি মানুষ পানি ও বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গত বুধবার হরমুজ প্রণালিতে চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং মাইন বিস্ফোরণে আরও তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে। যদিও নিরপেক্ষভাবে এই হামলার সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরান তার সামরিক ইউনিটগুলোকে এমন নির্দেশনা দিয়েছে যে, বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে এবং বেসামরিক প্রাণহানি বা কর্মকর্তাদের হত্যার ঘটনা ঘটলে পাল্টা জবাব সামরিক স্থাপনার বাইরে রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত গড়াবে। তবে এ হামলায় সফলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় শুক্রবার ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর এবং ইউরোপের তিনটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যেই পর্দার আড়ালে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছেন। এতে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ তুলে নেওয়া, পারমাণবিক স্থাপনায় পরিদর্শকদের সুযোগ দেওয়া এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তৃতীয় কোনো দেশে হস্তান্তরের বিনিময়ে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। আরব দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ইউরোপের দিকে ছুটবে।’।
সম্প্রতি ইসরাইলের কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি মহড়ায় অংশ নিয়েছে, যা উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে মধ্য ইরানের আরাক শহরের একটি বড় অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশটিতে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন গত চার মাসে সাতবার হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেও কূটনৈতিক অচলাবস্থায় দুই পক্ষই নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশটির ভেতরে অন্তর্ঘাতমূলক অভিযান চলার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। সেনা মোতায়েন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এমনিতেই চাপে থাকা ইসরাইলের অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের ধকল সামলাতে পারবে না।





