
নাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম হামলায় প্রাণ হারানোর ঘটনায় সংসদ সদস্যের ছেলেকে পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া এবং একই সময়ে সংসদ সদস্যের একটি স্পর্শকাতর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘটনার জেরে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আজিজের পদত্যাগ দাবি করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। বিক্ষুব্ধ জনতা ও বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে এমপির ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার পাশাপাশি একটি শপিং মলে ভাঙচুর চালিয়েছেন। এই দুই ইস্যুতে টালমাটাল নাটোরের রাজনীতি। ফেসবুক জুড়ে সমালোচনার পাশাপাশি ধিক্কার জানাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রায় পাঁচ মিনিটের তিনটি ভিডিও ক্লিপে আজিজকে এক নারীর সঙ্গে বিভিন্ন স্পর্শকাতর কথা বলতে দেখা যায়। অপরদিকে জানাজা শেষে বিক্ষোভকারীরা একটি শপিংমল ভাঙচুর করে। জানাজার পর পরই চাঁচকৈড় বাজারের রাশ আরবান মেগা শপিং মল ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় দুর্বৃত্তরা। ২০শে এপ্রিল নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন তিনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৪ই অক্টোবর রাত ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হেলমেট পরিহিত দুই যুবক শাকিলের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। প্রথমে তাঁকে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে রাজশাহী হয়ে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার রাত ৮টার দিকে ৩২ বছর বয়সী শাকিলের মৃত্যু হয়। শাকিলের বাবার নাম রবিউল করিম। তিনি জানান, তাঁর ছেলে আগে থেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন এবং এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন। তবে পুলিশ সে সময় বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। এমন কি এসময় তিনি নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। আশফাক নামের ওই আইডি থেকে এরইমধ্যে তার বিভিন্ন অপকর্ম ও তার দুই সন্তানের নানা ধরনের অনৈতিক কাজের সমালোচনা করা হচ্ছিল। এদিকে, সন্ত্রাসী হামলায় আহত হওয়ার ১২ দিন পর গত সোমবার রাত ৮টায় ঢাকার বিএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম। বিষয়টি এখন এলাকায় টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি ভাবছি।
ছাত্রদল নেতার মৃত্যুর পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার ঢাকা ও গুরুদাসপুরে শাকিলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার সময় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বক্তব্য দিতে গিয়ে নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিলে উপস্থিত জনতা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানায়। পরবর্তীতে গভীর রাতে একটি প্রবাসী আইডি থেকে সংসদ সদস্যের আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ পেলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য এমপি আজিজ এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এআই প্রযুক্তির সাহায্যে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করতে এই ভিডিও তৈরি করা হয়েছে এবং তিনি এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন। গত ক’দিনের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই খোদ এমপি আবদুল আজিজের আশালীন ভিডিও দৃশ্যত ক্ষোভের আগুলে ঘি ঢেলে দিয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে শাকিলের প্রথম জানাজা হয়। ফেসবুকে নিজের অশ্লীল ভিডিও ভাইরাল প্রসঙ্গে আব্দুল আজিজ এমপি বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মান ক্ষুণ্ন্ন করার জন্য এআই প্রযুক্তি দিয়ে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষ।
রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এমপি আজিজের দুই ছেলের নিজস্ব অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় কোন্দল চলছিল। নিহত শাকিল ছিলেন এমপির ছোট ছেলে ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুজ্জামান সোহাগের সমর্থক। অন্যদিকে শাকিল হত্যা মামলায় অভিযুক্ত নুরুজ্জামান মিন্টু হলেন এমপির বড় ছেলে, যিনি উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। শাকিল হত্যায় নাম উঠে আসার পর কেন্দ্র থেকে মিন্টুকে যুবদলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে পুলিশ তাঁকেও গ্রেপ্তার করে আদালত থেকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। এই হত্যা মামলায় আজিজের পুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত পরিপত্রে জানা যায়, জীবনহানির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কারের। যুবদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। দুই ভাইয়ের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বও আছে।
এদিকে শাকিল হত্যার ঘটনায় গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠে। রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আলম নিশ্চিত করেছেন যে, ওসি হান্নানকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা ছড়িয়ে পড়ায় নাটোরের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।





