১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নাবলুসে ইউসুফ (আ.)-এর মাজারে ইসরাইলি সেনাদের অভিযান ও তীব্র উত্তেজনা

Published: November 3, 2026, 12:45 pm

অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরে অবস্থিত হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মাজার হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনায় সম্প্রতি অভিযান পরিচালনা করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।

এই অভিযানের সময় সেনারা মাজার এলাকায় প্রবেশের পাশাপাশি শহরের পূর্বাঞ্চল ও আশপাশের বিভিন্ন বাড়িঘরে ব্যাপক তল্লাশি চালায়।

ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নাবলুসের আসকার আল-বালাদ এলাকায় অবস্থিত একটি বাড়িতেও তারা অভিযান চালায়। একই দিনে শহরের দক্ষিণে অবস্থিত বুরিন গ্রামে ইসরাইলি সেনাদের সামরিক তৎপরতা টানা চতুর্থ দিনে গড়ায়, যেখানে বাড়িঘরের জিনিসপত্র তছনছ করার মতো অভিযোগও পাওয়া গেছে। তথ্যসূত্র: ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা, আলজাজিরা, আল-কুদস, নিয়ার ইস্টার্ন আর্কিওলজি, মিডল ইস্ট আই, জার্নাল অব হলি ল্যান্ড অ্যান্ড প্যালেস্টাইন স্টাডিজ, জাতিসংঘের নথি ও আনাদোলু এজেন্সি।

নাবলুসের পাশাপাশি বেথলেহেমের বিভিন্ন এলাকায় এবং তুলকারেম অঞ্চলের কাফর আবুশ ও কাফর সুর থেকে চার ফিলিস্তিনি নাগরিককে আটকের তথ্যও পাওয়া গেছে। যদিও ইউসুফের মাজারে অভিযানের সময় কোনো আটকের খবর পাওয়া যায়নি। মাজারটি এমন একটি এলাকায় অবস্থিত যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন, ফলে ইসরাইলি বাহিনীর এই উপস্থিতি ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাজারটি কাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এই স্থাপনাটি নিয়ে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। মুসলমানদের কাছে এটি মাকাম ইউসুফ হিসেবে পরিচিত হলেও ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যে এটি বাইবেলীয় নবী জোসেফের সমাধি হিসেবে বিবেচিত। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণায়, যার মধ্যে ২০১৯ সালে লোয়াই আবু আলসাউদ ও আমের আল-কুব্বাজের প্রকাশনা উল্লেখযোগ্য, দেখা গেছে যে স্থাপনাটির বর্তমান স্থাপত্য মূলত উসমানীয় আমলের ইসলামি মাজার নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য বহন করে। গবেষকদের মতে, এখানে যে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর দেহাবশেষ রয়েছে তার কোনো শক্তিশালী প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মিসর থেকে তার দেহাবশেষ এনে এখানে সমাহিত করা হয়েছিল। তবে এর প্রকৃত সমাধিস্থলগত পরিচয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত গবেষণায় লোয়াই আবু আলসাউদ ও আমের আল-কুব্বাজ দেখিয়েছেন, স্থাপনাটি দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। ইতিহাসের গবেষণা, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য—প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়া কোনো স্থাপনার পরিচয়কে এককভাবে প্রতিষ্ঠা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। নাবলুসের ইউসুফের মাজার তাই কেবল মুসলমান ও ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি বিরোধপূর্ণ স্থান নয়; এটি ফিলিস্তিনের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, দখলদারত্ব এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার জটিল বাস্তবতারও প্রতীক।

মাজারটিকে কেন্দ্র করে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষের ইতিহাস অনেক পুরোনো। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সূচনালগ্নে ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে স্থাপনাটি এক ভয়াবহ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তৎকালীন জাতিসংঘে ইসরাইলের স্থায়ী প্রতিনিধির ৭ অক্টোবরের একটি চিঠিতে সে সময়কার নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে সমঝোতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে মাজারটি হস্তান্তর করার প্রসঙ্গ ছিল। পরবর্তীতে ২০০৫ সালেও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, যার পর স্থাপনাটির পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজ হয়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। ২০০০ সালের সংঘর্ষ ও মাজারটির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইতিহাস। ২০০০ সালে সংঘর্ষের পর মাজার থেকে ইসরায়েলি নিরাপত্তাকর্মীদের সরিয়ে নেওয়া এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্থাপনাটি সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে জাতিসংঘের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৯৫ সালের অসলো-২ চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে এ, বি ও সি—এই তিন অঞ্চলে বিভাজনের ফলে সৃষ্ট জটিলতার কারণে মাজারের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ সবসময়ই সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে টিকে আছে। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর থেকেই এই ভূখণ্ডের প্রশাসনিক ও সামরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বিবাদ চলে আসছে। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর শত শত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় সেখানে ধর্মীয় আচার পালন করতে গিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল, যখন স্থানীয় ফিলিস্তিনি পরিবারের ওপর স্নাইপার মোতায়েন ও যান দিয়ে এলাকা অবরুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। সামরিক অভিযান যদি স্থানীয় মানুষের চলাচল, শিক্ষা, বাড়িঘরের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তার প্রভাব একটি স্থাপনার সীমানা ছাড়িয়ে পুরো সমাজে বিস্তৃত হয়।

চলতি বছরের ১৩ মে তারিখেও অনুরূপভাবে সামরিক প্রহরায় বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশ ঘটেছিল, যার ফলে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে ৩০ অক্টোবরের সর্বশেষ অভিযানটি ছিল ভিন্নধর্মী; কারণ সেবার বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষার পরিবর্তে সেনাবাহিনী সরাসরি অভিযানে অংশ নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর অধিকৃত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী বসতি স্থাপন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ ও ৫৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিক ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুরক্ষার বিধান থাকলেও সামরিক অভিযানগুলোতে এর লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়মিত পাওয়া যায়। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং ৫৩ অনুচ্ছেদে দখলদার শক্তির দ্বারা ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন অনুযায়ী সশস্ত্র সংঘাতের সময় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা সংরক্ষণ করা সব পক্ষের জন্য অপরিহার্য। ঐতিহ্য সংরক্ষণই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।

ধর্মীয় অধিকার রক্ষা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্যতাকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব, স্থানটির ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করা এবং এর প্রত্নতাত্ত্বিক পরিচয় সম্পর্কে প্রমাণনির্ভর থাকা—দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। দুটি ঘটনাকে এক করে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি অস্পষ্ট হয়ে যাবে।

নাবলুসের এই ঘটনাটি শুধু একটি মাজারকেন্দ্রিক বিষয় নয়, বরং অধিকৃত ফিলিস্তিনের সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা ও দৈনন্দিন জীবনের ওপর সামরিক অভিযানের প্রভাবকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।