১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরাইলে সামরিক সহায়তা বন্ধে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতা ট্রাম্পের

Published: November 4, 2026, 12:05 am

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইসরাইলকে প্রতিবছর দেওয়া ৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সমঝোতা হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ট্রাম্প এই বড় ধরনের সিদ্ধান্তের কথা জানান। চলতি বছরের শেষ নাগাদই ওয়াশিংটন এই অর্থায়ন বন্ধ করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরও ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে। ওই সময়সীমার পর ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরাইলের বর্তমান পরিস্থিতিতে আর এত বড় অংকের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন নেই। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, কয়েক মাস আগেই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং এ বছর থেকেই তা কার্যকর হবে। তবে তিনি কোন নির্দিষ্ট তহবিল বা বাজেট থেকে এই অর্থ কাটছাঁট করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। উল্লেখ্য, বর্তমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরাইলকে বছরে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ট্রাম্পের এই নাটকীয় ঘোষণার পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু বামপন্থি ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক ইসরাইলের জন্য মার্কিন সহায়তার বিষয়টিকে রিপাবলিকানদের সমালোচনার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে মিশিগান থেকে নির্বাচনে দাঁড়ানো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ট্রাম্প স্পষ্ট বলেন, যখন ইসরাইলের এই অর্থের প্রয়োজন নেই, তখন দেশের অভ্যন্তরে এ নিয়ে অযৌক্তিক আক্রমণের শিকার হতে তিনি আগ্রহী নন। ট্রাম্প বলেন, বামপন্থিরা যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থায়নকে ‘অন্যায্যতার সংকেত’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যা তিনি হতে দিতে পারেন না। এটি একটি খারাপ, খুব খারাপ রাজনৈতিক বক্তব্য।’।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনসমর্থন বর্তমানে আগের তুলনায় অনেক কমেছে। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশ মনে করে ওয়াশিংটন ইসরাইলকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সহায়তা দিচ্ছে। ২০১৭ সালে এই অনুপাত যেখানে মাত্র ২০ শতাংশ ছিল, তা ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৬৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ইসরাইলের সমালোচক প্রার্থীরাও এখন দলের ভেতর শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছেন। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনসমর্থন কমেছে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে। জুনে কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, ৪৮ শতাংশ মার্কিন ভোটার এবং ৬৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে অতিরিক্ত সহায়তা দিচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রথমবার এ প্রশ্ন করা হলে এ হার ছিল যথাক্রমে ১৬ ও ২০ শতাংশ। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর।

নেতানিয়াহুর সরকার নিয়েও ইসরাইলের ভেতরে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। এমন অস্থির সময়ে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সামরিক সহায়তা বন্ধের এই ঘোষণা ইসরাইলের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নিজেও অতীতে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ধারা চিরস্থায়ী নাও থাকতে পারে।

ট্রাম্পের নিজের দলের ভেতরেও ইসরাইলবিরোধী একটি পক্ষ ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছে। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলনের সমর্থকরা অভিযোগ তুলছেন, ইসরাইল ট্রাম্পকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্পকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে ইরানকে সহজেই যুদ্ধে হারিয়ে দেওয়া সম্ভব। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কায় রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্পকে ইসরাইল বিশ্বাস করিয়েছিল, ইরানকে সহজেই যুদ্ধে পরাজিত করা সম্ভব।

২০২০ সালে মার্কিন কংগ্রেস ইসরাইলের জন্য যে অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছিল, তা প্রতিবছর বরাদ্দ বিল পাসের মাধ্যমেই ছাড় করতে হয়। ফলে মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের বর্তমান ক্ষমতার লড়াই এই অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। যদিও সহায়তা বন্ধের বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

নেতানিয়াহু গত অক্টোবরে ইসরাইলি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কয়েক দশক ধরে আমেরিকা যে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, তা আর একইভাবে অব্যাহত থাকবে না। তিনি দেশবাসীকে এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় অভ্যস্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখন ট্রাম্পের এই ঘোষণায় তা কার্যত বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে।