১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার উৎস: যেভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করছেন তিনি

Published: November 4, 2026, 6:41 pm

চীনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় শি জিনপিংয়ের উত্থান কেবল একজন নেতার দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি নির্দেশ করে না, বরং এটি দেশটির শাসনব্যবস্থার বড় ধরনের রূপান্তরের প্রতীক।

২০১২ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শি জিনপিং ধাপে ধাপে রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর আগে কোনো নেতা এভাবে টানা তৃতীয় মেয়াদে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাননি মাও সেতুং-পরবর্তী সময়ে।

২০১৮ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার, ২০২২ সালে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা এবং দলীয় সংবিধানে নিজের রাজনৈতিক দর্শন অন্তর্ভুক্ত করা তার ক্ষমতা সংহত করার একেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের নির্দেশনা কার্যকর করার সক্ষমতা বাড়ে।

শি জিনপিংয়ের কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হলো রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। আগে থেকেই দল ও রাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও, শি সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করেছেন। কার্নেগি এনডাওমেন্টের ২০২৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী, এই নতুন ব্যবস্থায় যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সরকারি মন্ত্রণালয়ের চেয়ে দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। এর ফলে প্রশাসনিক বাধার চেয়ে দলীয় কাঠামোর আদেশ পালনই কর্মকর্তাদের কাছে মূখ্য হয়ে উঠেছে। চীনে আগে থেকেই দল ও রাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কার্নেগি এনডাওমেন্টের ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শি আমলে দলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে। শির দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে মূলত দলীয় কাঠামোয় তার অবস্থান এবং উত্তরসূরি নির্ধারণের অনিশ্চয়তার কারণে। ডিজিটাল নজরদারি, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণক্ষমতা বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও এই প্রক্রিয়ার অংশ। এতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বেসরকারি খাত ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করা। মেরিকসের ২০২৬ সালের গবেষণাও দেখিয়েছে, দেশীয় ও বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয় কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য দলীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হচ্ছে। এই জাতীয়তাবাদী বয়ান দেশের জনগণকে একটি অভিন্ন লক্ষ্য ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অধীনে সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি করে। তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে চীনের অবস্থানও এই বয়ানের অংশ। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, অবকাঠামো বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি রপ্তানি, বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে তিনি দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে প্রকৃত দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম এখনো চলমান।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ৩১ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দলীয় সংস্থাগুলো ৮১ লাখের বেশি তদন্ত চালিয়েছে এবং প্রায় ৭৯ লাখের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ওপর পুনরায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

প্রশাসনিক পদে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ব্রুকিংসের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, শীর্ষ নেতৃত্বে ক্রমাগত পরিবর্তন এনে তিনি আনুগত্যকে যোগ্যতার চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত চীনের দুই অধিবেশন বিশ্লেষণ করে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন এই প্রক্রিয়াকে ‘জিনট্রালাইজেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে অর্থনীতি ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রশাসন ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় দলীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বাড়ানো হয়েছে। ব্রুকিংসের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বিশ্লেষণে শীর্ষ নেতৃত্বে ধারাবাহিক পরিবর্তন এবং আস্থাভিত্তিক নিয়োগের জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে।

সামরিক বাহিনীর ওপর নিজের প্রভাব আরও গভীর করতে শি জিনপিং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সিএসআইএসের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর থেকে শতাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা অপসারণ বা তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলিকে তদন্তের আওতায় আনার ঘটনা এটিই প্রমাণ করে যে, সেনাবাহিনীতেও তিনি ব্যক্তিগত আনুগত্য যাচাইয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। ২০২২ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে তিনি তৃতীয়বারের মতো কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সিএসআইএসের ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর গবেষণা অনুসারে, ২০২২ সালের পর থেকে শতাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা অপসারিত হয়েছেন বা প্রকাশ্য পরিসর থেকে হারিয়ে গেছেন।

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ চীনের শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। মেরকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় গ্রাম পর্যায় থেকে শুরু করে বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বত্র পার্টির নজরদারি বিস্তৃত। একইসঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পাস হওয়া বিভিন্ন জাতীয় ও সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তি আইনের সংশোধন এই বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণেরই অংশ। ২০১৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইন, ২০১৬ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০১৭ সালের জাতীয় গোয়েন্দা আইন, ২০২১ সালের তথ্য নিরাপত্তা আইন এবং ২০২৩ সালের পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তি আইনের সংশোধন এই বিস্তৃত নিরাপত্তাকাঠামোর অংশ।

জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ‘চীনা স্বপ্ন’-এর ধারণাকে তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কাজে লাগাচ্ছেন। লোই ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়, অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি জাতীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধারের এই আকাঙ্ক্ষা তাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে সহায়তা করেছে। বেইজিং এখন ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করছে।

তবে এই ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের পেছনে বেশ কিছু ঝুঁকির কথাও বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন। ব্রুকিংসের ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত আনুগত্যের সংস্কৃতিতে প্রশাসনের ভেতরে সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এছাড়া, সামরিক বাহিনী ও দলীয় নেতৃত্বে ব্যাপক অপসারণের ফলে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ নেতৃত্বের সংকট তৈরি হতে পারে, যা শি জিনপিংয়ের নিজের শাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর ফলে সামরিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধপ্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। শি জিনপিংয়ের শাসনে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা শুধু সীমান্ত, সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নেই।