
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের মঞ্চে তখন প্রায় পাঁচ হাজার দর্শক।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত প্রতিভাবান কিশোর-তরুণ শিল্পীরা নিজেদের সৃজনশীলতা তুলে ধরছেন। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীদের পরিবেশনা চলছে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকেরাও উপস্থিত ছিলেন।
এমন জমকালো আয়োজনে জ্যাজ, পপ, গ্রাইম কিংবা ধ্রুপদি সংগীতের মূর্ছনায় মুখরিত ছিল পুরো মিলনায়তন। ভাষা বা সংগীতের ধরন–নির্বিশেষে সব ধরনের সংগীত তার কাছে উপভোগ্য। সেটি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত কিংবা উভয়ের সমন্বয়ে হতে পারে। এই সংগীত দলের জন্য তার রচিত গান যুক্তরাজ্যসহ বিদেশে পরিবেশিত হয়েছে।
এই প্রতিযোগীদের ভিড়েই পিয়ানো নিয়ে মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। নিজস্ব পিয়ানো কম্পোজিশন পরিবেশন করে সে বিচারকদের মুগ্ধ করে এবং শেষ পর্যন্ত ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’ সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নের খেতাব জয় করে। এবারের প্রতিযোগিতায় হাজারো আবেদন জমা পড়ে।
বুধবার লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ২০২২ সালে শুরু হওয়া ‘ফিউচার মেকার্স’ মূলত ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ শিল্পীদের জাতীয় একটি প্ল্যাটফর্ম। হাজারো প্রতিযোগীর মধ্য থেকে প্রাথমিক বাছাই এবং সরাসরি অডিশনের ধাপগুলো পার হয়ে নাভহানসহ মোট ৯ জন চূড়ান্ত পর্বে লড়াই করার সুযোগ পেয়েছিলেন। চূড়ান্ত পর্বে অভিজ্ঞ সংগীতজ্ঞদের মূল্যায়নে বিচারকরা তাকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এভাবে চূড়ান্ত পর্বের শিল্পীদের নির্বাচন করা হয়। এই প্রতিযোগিতার বিশেষত্ব বিজয়ীকে শুধু সম্মাননা দেওয়া নয়।
নাভহান এই প্রতিযোগিতায় তার নিজের রচিত পিয়ানো কম্পোজিশন ‘লা দ্যুল্যর এক্সকিজ’ (La Douleur Exquise) পরিবেশন করে। ফরাসি শব্দগুচ্ছটির অর্থ তীব্র বেদনা। এফ-শার্প মাইনর স্কেলে রচিত এই সুরের মাধ্যমে সে যুদ্ধ ও ভালোবাসার গল্প ফুটিয়ে তুলেছে। পিয়ানোর পদাঘাতে ডান ও বাঁ হাতের বিপরীতধর্মী সুরের বিন্যাসে সে মানুষের মধ্যকার সংঘাত ও আবেগের জটিলতা তুলে ধরে। তার সংগীতের মূল বার্তা ছিল ঘৃণা ও সংঘাতের বিপরীতে ভালোবাসার জয়গান গাওয়া। যুদ্ধের বিপরীত দুই প্রেমিক-প্রেমিকার গল্পকে সংগীতের মাধ্যমে তুলে ধরে নাভহান। তাঁর মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর গাওয়া ঘুমপাড়ানি গানের সুর অনুকরণের চেষ্টা করত নাভহান। এই দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে নাভহান ছোট।
ধ্রুপদি সংগীতের প্রতি নাভহানের ঝোঁক অনেক ছোটবেলা থেকেই। বিখ্যাত সুরকার ফ্রেদেরিক শোপাঁ, সের্গেই রাখমানিনভ ও ফ্রানৎস লিস্টের সৃষ্টি তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। তবে তার সংগীতের আগ্রহ শুধু ধ্রুপদি ধারাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্যাজ, রক এবং পপ সংগীতকেও সে সমানভাবে উপভোগ করে। বড় বোনের সংগীতচর্চা শৈশব থেকে নাভহানকে অনুপ্রাণিত করেছে।
নাভহানের মা রুবেনা চৌধুরী জানান, হাজারো আবেদনের ভিড় থেকে নির্বাচিত হয়ে নাভহান মে মাসে অডিশনে অংশ নেয়। এরপর জুন মাসের সরাসরি অডিশনে ২৫ জনের মধ্যে জায়গা করে নেয় এবং সেখান থেকে চূড়ান্ত পর্বে উন্নীত হয়। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে আগামী এক বছর সে সংগীতশিল্পের পেশাদারদের সরাসরি পরামর্শ ও সহায়তা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে রেকর্ড উৎপাদন, প্রচারণার সুযোগ এবং রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের এলগার রুমে নিজস্ব সংগীত পরিবেশনার বিশেষ সুবিধা। পরবর্তী ধাপে জুনে অনুষ্ঠিত সরাসরি অডিশনে অংশ নেওয়া ২৫ জনের মধ্যেও নাভহান জায়গা করে নেয়। এর মধ্যে সংগীত প্রযোজনা, রেকর্ডিং, প্রচারণা ও পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তোলার বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে নাভহান যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী হ্যারো স্কুলের শিক্ষার্থী। ১৩ বছর বয়সে সংগীতবৃত্তি নিয়ে সে এই বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। সেখানে সে পিয়ানো ও চেলো নিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। অল্প বয়সেই সংগীতের গ্রেড পরীক্ষায় সে ‘ডিস্টিংশন’ অর্জন করে অসামান্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। সে স্কুলের সিম্ফনি ও স্ট্রিং অর্কেস্ট্রার সদস্য এবং বায়রন কনসোর্ট চেম্বার কয়ারের সাথেও যুক্ত। এমনকি হ্যারো স্কুলের বাইরেও বিভিন্ন ব্যান্ডের সাথে সে পারফর্ম করে থাকে। বর্তমানে খ্যাতিমান শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে উভয় বাদ্যযন্ত্রে ডিপ্লোমা পর্যায়ের যোগ্যতা অর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক পেশায় কর্মরত।
সংগীতের প্রতি নাভহানের আগ্রহ ছিল শৈশব থেকেই। তার মা রুবেনা চৌধুরী জানান, আট বছর বয়স থেকে সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করে। এর আগে সে ব্রেন্টউড স্কুলের বৃত্তিধারী শিক্ষার্থী ছিল এবং লন্ডনের গিল্ডহল স্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামাতেও প্রশিক্ষণ নিয়েছে। নাভহানের রয়েছে ‘পারফেক্ট পিচ’ বা নিখুঁতভাবে স্বর শনাক্ত করার বিরল দক্ষতা। সাত বছর বয়স থেকে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান গাইতেন তিনি। লন্ডনের ভারতীয় বিদ্যা ভবনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। তবে নাভহানের জন্মের কারণে তৃতীয় বছরের প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারেননি তিনি।
নাভহানের বাবা মোহাম্মদ চৌধুরী, যিনি ভুলন চৌধুরী নামে পরিচিত, মূলত দিনাজপুরের সন্তান। তিনি ১৯৯৪ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তার মা রুবেনা চৌধুরীর আদি বাড়ি সিলেটে এবং তিনি যুক্তরাজ্যে আছেন ১৯৭৯ সাল থেকে। নাভহানের সংগীতের হাতেখড়ি ও অনুপ্রেরণায় তার মায়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম, যিনি নিজেও শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এছাড়া নাভহানের বাবার ফুফা ছিলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী এবং খ্যাতনামা গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে জন্ম নাভহানের।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে লন্ডনের ঐতিহাসিক ড্রেপার্স হলে সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের বিনিয়োগ কমিটির আয়োজনে নিজের সুর পরিবেশন করে সে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। আজকের এই সাফল্য নাভহানের ভবিষ্যতের পেশাদার সংগীতজীবনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।





