
ব্রিটেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিএজিই ইন্টারন্যাশনাল গত ২২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওয়ার অন টেরর প্রিজনার অব কনসায়েন্স’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই স্বীকৃতির পর মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার নেতাদের নীরবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইসলামাবাদভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম এন্ড ডিকলোনাইজেশন-এর পরিচালক অধ্যাপক জুনায়েদ এস. আহমদ ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই ইস্যুটি সামনে এনেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিএজিই ইন্টারন্যাশনাল মূলত নির্বিচার আটক, নির্যাতন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কাজ করে। উল্লেখ্য যে, ইমরান খান অতীতে ড্রোন হামলা ও ‘ওয়ার অন টেরর’-এ পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে সরব ছিলেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলা ও কাশ্মীর ইস্যুতে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সিএজিই-এর এই নতুন পদক্ষেপ এখন বড় একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের যে মানদণ্ড নিয়ে মুসলিম নেতারা কথা বলেন, তা কি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে?
ইমরান খানের কারাবাস নিয়ে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমরান খানের ন্যায্য বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া, দীর্ঘ সময় একাকী বন্দিত্ব এবং আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এছাড়া জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রেরি ডিটেনশন-এর পর্যবেক্ষণও সংস্থাটি আমলে নিয়েছে। জাতিসংঘের নির্যাতন বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডসও ইমরান খানের কারাবাসের পরিবেশকে ‘অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর’ হিসেবে অভিহিত করে পাকিস্তানকে সতর্ক করেছেন, যা নির্যাতন বা নিষ্ঠুর আচরণের পর্যায়ে পড়তে পারে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে কেবল ইমরান খানের কারাবাস নয়, বরং মানবাধিকার ইস্যুতে দ্বিমুখী নীতি। ফিলিস্তিন বা কাশ্মীরের ক্ষেত্রে মুসলিম সংগঠনগুলো যে দৃঢ় অবস্থান নেয়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কেন একই তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পর্যবেক্ষকরা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ এবং গণগ্রেপ্তারের মতো ঘটনা ঘটছে। জুন ও জুলাইয়ের এসব ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সাবেক সিনেটর মুশতাক আহমদ খানের উদাহরণ দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, গাজামুখী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া এই নেতাকে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় আটক করা হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন ও পশ্চিমা মানবাধিকার কর্মীরাও বর্তমানে ইমরান খানের বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০০৮ সালে আফিয়া সিদ্দিকির মামলা আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইমরান খানের যে ভূমিকা ছিল, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির যোগসূত্র টানছেন অনেকেই। সবশেষে, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের নেতারা শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেন, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ প্রসঙ্গে কাশ্মীরের পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একইভাবে সন্ত্রাসবিরোধী আইন বা আটক ব্যবস্থার সমালোচনা কোনো নির্দিষ্ট দেশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বত্র একই মানবাধিকার মানদণ্ডে বিচার করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।





