
বক্সিং রিংয়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী তারকা মাইক টাইসনকে নিয়ে বিতর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঐতিহাসিক সাফল্য যেমন তাঁর ক্যারিয়ার উজ্জ্বল করেছে, তেমনি কারাবাস, দাম্পত্য কলহ, আইনি মামলা ও বিপুল আর্থিক পতনের মতো ঘটনাগুলো তাঁকে রেখেছে গণমাধ্যমের শিরোনামে। গত ১৩ অক্টোবর জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে চার পর্বের প্রামাণ্যচিত্র ‘টাইসন’। ওটিটিতে প্রকাশের পর সিরিজটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেলেও, সেখানে তুলে ধরা বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনার উপস্থাপন পদ্ধতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ঘটনাটি বক্সিং ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিস্ময়কর মুহূর্ত।
নেটফ্লিক্সের তথ্যানুযায়ী, প্রকাশের প্রথম সপ্তাহেই ইংরেজি ভাষার টিভি সিরিজের বৈশ্বিক তালিকায় চতুর্থ স্থান দখল করে এই প্রামাণ্যচিত্র। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহেই এটি দেখার সংখ্যা পৌঁছায় ৫১ লাখে। পরের সপ্তাহেও দর্শক সংখ্যা বজায় থাকে; ১৯ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয় আরও ৩৮ লাখ ভিউ। সব মিলিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহে সিরিজটির মোট ভিউ দাঁড়ায় ৮৯ লাখে। দর্শকদের এমন বিপুল আগ্রহ সত্তেও সমালোচকদের বড় একটি অংশ প্রামাণ্যচিত্রটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সিরিজের পরের পর্বগুলোয় এসব ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে।
প্রামাণ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন ফ্লয়েড রাস, যিনি ইতিপূর্বে ‘আনটোল্ড: ম্যালিস অ্যাট দ্য প্যালেস’ এবং ‘আমেরিকান ম্যানহান্ট: দ্য বোস্টন ম্যারাথন বম্বিং’-এর মতো আলোচিত নির্মাণে কাজ করেছেন। তিনি ছাড়াও নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন বিল সিমন্স, জিম গ্রে, আমান্ডা স্পেন, ইয়োনা ম্যাকলাফলিন, গ্রেগ সি লেক, মাইকেল হিউজ, ডগলাস ব্যাংকার ও ফ্লয়েড রাস নিজে। সিরিজটির প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জেনা মিলম্যান, জ্যাকব মিলার ও অ্যালেক্সা গিন্সবার্গ। ডকুসিরিজটির আবহসংগীত পরিচালনা করেছেন রাফার্টি। পুরোনো ছবি ও ভিডিও সংগ্রহের জন্য চারজন আর্কাইভ প্রযোজক টানা ১৬ মাস কাজ করেছেন।
নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে নেটফ্লিক্সের টুডামকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক ফ্লয়েড রাস জানান, আট থেকে বারো মাসের মধ্যে মাইক টাইসনের প্রায় আটটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসে কথা বলা নয়, বরং তাঁর শৈশবের এলাকা ব্রাউনসভিল, বক্সিং প্রশিক্ষণের পুরোনো জিম, লাস ভেগাস এবং ফ্লোরিডায় তাঁর বর্তমান বাড়িতে গিয়ে শুটিং চালিয়েছে পুরো দল। বিরল ও অপ্রকাশিত পুরোনো ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করে ৬০ বছর বয়সী টাইসনকে নিজের জীবনের অতীতকে অন্যভাবে মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন নির্মাতা। নিজের জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় হিসেবে কাসের তত্ত্বাবধানে কাটানো দিনগুলোর কথা বলেছেন। নির্মাতা জানান, ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যে টাইসনের সঙ্গে প্রায় আটবার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাঁরা। রাসের ভাষায়, টাইসনের জীবনের গল্প আগেও অনেকবার বলা হয়েছে।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিলে ১৯৬৬ সালের ৩০ জুন জন্ম নেওয়া টাইসনের শৈশব ছিল ভীষণ জটিল। চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিরতা ও সহিংস পরিবেশের কারণে ছোটবেলায় সহপাঠীদের বুলিংয়ের শিকার হতেন তিনি। কৈশোরে পা দেওয়ার আগেই জড়িয়ে পড়েছিলেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে; ফলে ১৩ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার হতে হয়। সেই অন্ধকার শৈশব থেকে তাঁকে রিংয়ের আলোর নিচে নিয়ে আসেন কিংবদন্তি প্রশিক্ষক কাস ডি’আমাতো। ডি’আমাতোর কঠোর নজরদারি ও সঠিক দিকনির্দেশনায় দ্রুতই এক অপ্রতিরোধ্য অ্যাথলেটে পরিণত হন টাইসন। টাইসনের প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি তিনি। এর ফলে তাঁকে খেলার বাইরে থাকতে হয়, জরিমানাও গুনতে হয়।
১৯৮৫ সালে পেশাদার বক্সিংয়ে অভিষেক ঘটে মাইক টাইসনের। একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দ্রুত শীর্ষে পৌঁছান তিনি। ১৯৮৬ সালে ট্রেভর বারবিককে পরাস্ত করে মাত্র ২০ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ হেভিওয়েট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাব নিজের করে নেন। এরপর ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর বিশ্ব হেভিওয়েট সাম্রাজ্যে নিজের একক আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন টাইসন, পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘দ্য ব্যাডেস্ট ম্যান অন দ্য প্লানেট’ হিসেবে। খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছাড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এই সাফল্যের পেছনে বড় কারণ টাইসনের পরিচিতি। কিন্তু এ বয়সে এসে তিনি যেভাবে নিজের অতীত নিয়ে ভাবছেন, সেটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে। এতে দর্শক একই ঘটনা সম্পর্কে তরুণ টাইসন কী বলেছিলেন এবং এখন বয়সের ভারে অভিজ্ঞ একজন মানুষ হিসেবে কীভাবে সেটি দেখছেন, তা তুলনা করতে পারবেন। টাইসনের জীবনে এত বেশি নাটকীয় ঘটনা রয়েছে যে প্রতিটি পর্বই আলাদা গল্পের মতো।
সফলতার চূড়ান্ত চূড়ায় ওঠার পর টাইসনের ব্যক্তিজীবনে চরম অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অভিনেত্রী রবিন গিভেন্সের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও তা স্থায়িত্ব পায়নি। দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নানা অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে বিচ্ছেদ তাঁকে তীব্র মানসিক ও আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। ১৯৯০ সালে খেতাব লড়াইয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে বস্টার ডগলাসের কাছে হেরে যান তিনি, যার মাধ্যমে রিংয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজত্বের অবসান ঘটে। কেউ বলছেন, জীবনের নানা উত্থান-পতন নিয়ে টাইসনের এমন অকপট স্বীকারোক্তি আগে দেখা যায়নি। বক্সিংয়ের রিংয়ে তাঁর ভয়ংকর উপস্থিতি, প্রতিপক্ষকে নকআউট করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিতর্ক—সব মিলিয়ে কয়েক দশক ধরেই তিনি আলোচনায়। এরপর ১৯৯৭ সালে ইভান্ডার হলিফিল্ডের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের কানে কামড় বসিয়ে দেন তিনি।
ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের এখানেই শেষ ছিল না। ১৯৯২ সালে গুরুতর আইনি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে টাইসনকে কারাগারে যেতে হয়। তিন বছরেরও বেশি সময় জেল খাটার পর মুক্ত হলেও সেই আইনি বিতর্ক তাঁর ক্যারিয়ারকে চিরতরে বদলে দেয়। তিনি শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে এক্সোডাসের দুর্ঘটনাজনিত অকালমৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে আরও ভেঙে ফেলে। তবে সব বিপর্যয় সামলে ২০২৪ সালে ইউটিউবার ও বক্সার জেক পলের সঙ্গে একটি রিং লড়াইয়ে নেমে পুনরায় বিশ্বজোড়া আলোচনার কেন্দ্রে আসেন তিনি। আবার কারও অভিযোগ, নিজের অপরাধ ও বিতর্কের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এই সাবেক বক্সার। নির্মাতারাও শুরু থেকেই চেয়েছেন, খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে একজন মানুষের জীবন, খ্যাতি, ক্ষমতা, অপরাধবোধ ও আত্মপরিচয়ের সংকটকে সামনে আনতে। একসময় যাঁর নাম শুনলেই প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি তৈরি হতো, সেই টাইসনই ধীরে ধীরে নিজের আচরণ ও সিদ্ধান্তের কারণে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন।
প্রামাণ্যচিত্রে টাইসনের ব্যক্তিগত সব সংকট, অর্থ অপচয়, অ্যালকোহল ও মাদকের প্রতি আসক্তি এবং শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই বিশদভাবে উঠে এসেছে। সিরিজের শেষ পর্বে টাইসন ও পরিচালককে সাইকেডেলিক উপাদানের এক বিশেষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে দেখা যায়। টাইসনের দাবি, ‘টোড’ নামের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে দীর্ঘদিনের কোকেন ও অ্যালকোহলের মারাত্মক আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল।
টাইসনের জীবন নিয়ে ২০০৮ সালে একটি ডকু-সিনেমা এবং ২০১২ সালে স্পাইক লির পরিচালনায় ব্রডওয়েতে একক মঞ্চ পরিবেশনা হয়েছিল। তবুও নতুন এই সিরিজটি নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু রেনডম রিভিউ সংগ্রাহক ওয়েবসাইট ‘রটেন টমেটোজে’ প্রামাণ্যচিত্রটি ৮৬ শতাংশ রেটিং পেলেও এর বিষয়বস্তু উপস্থাপন নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। মুক্তির পর থেকেই দর্শকের আগ্রহের পাশাপাশি সমালোচকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। রিভিউ সংকলনকারী ওয়েবসাইট রটেন টমেটোজে সাতজন সমালোচকের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটির স্কোর ৮৬ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর সমালোচক বেনজি উইলসন সিরিজটিকে চারটির মধ্যে চার তারকা দিয়ে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, টাইসনের ব্যক্তিত্বে যে আগ্রাসন ও অনিশ্চয়তা ছিল, তা-ই ছিল তাঁর রিংয়ের আকর্ষণ, যা ডকুসিরিজে সঠিকভাবে ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে ‘দ্য হলিউড রিপোর্টার’-এর ড্যানিয়েল ফিয়েনবার্গও মনে করেন, পর্দায় টাইসনের অনবদ্য আবেগ দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছে। আবার ‘দ্য অবজারভার’-এর সমালোচক বারবারা এলেন লিখেছেন, টাইসনের জীবনের অস্বস্তিকর ও ক্ষতিকর দিকগুলো ঢেকে রাখার চেষ্টা না করে তুলে ধরায় সিরিজটি শক্তিশালী হয়েছে। একই ধরনের ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন ‘দ্য আইরিশ টাইমস’-এর এড পাওয়ারও।
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর পর্যালোচনায়। পত্রিকাটির সমালোচক হান্না জে ডেভিস এই চার পর্বের ডকুসিরিজকে চারটির মধ্যে মাত্র এক তারকা দিয়েছেন। তাঁর মূল অভিযোগ, গুরুতর আইনি অপরাধ এবং নারীদের প্রতি করা অবিচারের বিষয়ে প্রামাণ্যচিত্রে টাইসনকে যথাযথ জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়নি। অভিযোগকারীদের বক্তব্য সরাসরি তুলে ধরার পরিবর্তে টাইসন ও তাঁর কাছের মানুষের বয়ানকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিয়ে পুরো প্রামাণ্যচিত্রের ভারসাম্য নষ্ট করা হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা। একপেশে এই উপস্থাপনার কারণে ইতিহাস ও সত্য কতটা সঠিকভাবে উপস্থাপিত হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।





