
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার হোগলাবুনিয়া গ্রামের সাধারণ এক তরুণ চিরনজিৎ বিশ্বাস। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক থাকলেও পেশাদার অভিনয়ের কথা কখনো চিন্তাতেও ছিল না তাঁর। অথচ সেই চিরনজিৎ আজ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার খেতাব অর্জন করেছেন। প্রথম সিনেমা ‘দেলুপি’-তে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি উত্তর আমেরিকার তাসভির চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন। ফোনের রিংটোনে ঘুম ভাঙল চিরনজিৎ বিশ্বাসের। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে কথা বলতেই শুনলেন সুখবর। তার ওপর নদীতে শুটিংয়ের একটি দৃশ্য ছিল। নিজের উপজেলায় একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে ছবি তোলা, কথা বলা ও অটোগ্রাফ দেওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। আগে যে অবস্থানে ছিলাম, সেখান থেকে আজ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছি।
পুরস্কার পাওয়ার খবরটি পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের কাছ থেকে ফোন পেয়ে নিশ্চিত হন চিরনজিৎ। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতির আনন্দ নিজের ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, এটি কেবল একক অর্জন নয়, বরং পুরো চলচ্চিত্র দলের সম্মিলিত মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের ফসল। গত বছরের ৭ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার জন্য চিরনজিতের পক্ষ থেকে পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন পরিচালক নিজেই। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে চিরনজিৎ বিশ্বাস বলেন, ‘এই অনুভূতি আসলে মুখের ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পরিচালকের কাছে সে ভয়ও প্রকাশ করেছিলেন।
অভিনয় জীবনের শুরুটা হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়, স্কুলের শিক্ষিকা নূপুর মণ্ডলের লেখা ‘বাল্যবিবাহ’ নাটকে। সেই নাটকে ঘটকের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে প্রথম পা রাখা। এরপর মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘বাল্যবিবাহ’ নাটকেই মাতালের চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন। স্কুলজীবনে মুক্তিযোদ্ধা, টিক্কা খান থেকে শুরু করে নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগকে তিনি বড় করে দেখেছেন। এই অদিতি আবার একটি যাত্রাদলের সঙ্গে অভিনয় করতেন। তাঁদের কাজ দেখেই অভিনয়ের নানা দিক শেখার চেষ্টা করেন।
কলেজে ওঠার পর অদিতি নাট্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর নাট্যচর্চায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। ২০২০ সাল থেকে এই দলের হয়ে নিয়মিত পথনাটক, মাঠমহড়া ও মঞ্চনাটকে অংশ নিতে থাকেন। দলের নাটকে নদীপারের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম ও প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প উঠে আসত। বন্ধু অদিতির মাধ্যমে পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং অডিশনের মাধ্যমেই ‘দেলুপি’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। সেই সূত্র ধরেই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য অডিশন দেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এসব নাটক নিয়ে গেছেন তাঁরা। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা, একসঙ্গে স্কুল-কলেজে পড়া, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের পরিচয়। সেই দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে খুলনায় আসেন মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম ও তাঁর দল।
প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা সহজ ছিল না জানিয়ে চিরনজিৎ বলেন, কিছুটা জড়তা ও ভয় কাজ করত, বিশেষ করে নদীর শুটিং দৃশ্যে শুশুক দেখে তিনি ভীত ছিলেন। তবে নির্মাতা ও সহশিল্পীদের সহযোগিতায় সেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে তিনি এখন এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন এবং দর্শক-শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে পাচ্ছেন ভূয়সী প্রশংসা। তবে সহশিল্পী ও নির্মাতাদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে জড়তা কাটে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে চঞ্চল চৌধুরী ও শাহরুখ খানকে নিজের অনুপ্রেরণা মনে করেন চিরনজিৎ। আন্তর্জাতিক এই পুরস্কার তাঁকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে অভিনয় নিয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার। তিনি জানান, ‘দেলুপি’ সিনেমাটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের পথ চলার প্রেরণা জোগাচ্ছে। বাংলাদেশে চঞ্চল চৌধুরী তাঁর পছন্দের অভিনেতা। ভারতীয় অভিনেতাদের মধ্যে শাহরুখ খানের ভক্ত তিনি।





