
সৌদি আরবে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া অধিকাংশ কনটেন্টই এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত না হয়েই অনেক পুরনো ভিডিও ও অন্য ব্যক্তির মরদেহ আনার ছবিকে কেন্দ্র করে ভুয়া প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পথচারীদের রাস্তা পারাপার হওয়া জেব্রা ক্রসিংয়ের নিকটে কালো রঙের বোরকা পরা এক নারীকে ঘিরে আছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য। ঘেরাওয়ের মধ্যে কালো পোশাক পরা ওই নারীকে আরবি ভাষায় বলতে শোনা যায়, ‘আমি হত্যা করিনি। আমি হত্যা করিনি…আমি তোমাদের ক্ষমা করব না…এটা অবিচার।’। সাদা পোশাক পরা ব্যক্তি তাঁকে মাটিতে শুইয়ে দেন। ঘটনাস্থল পথচারীদের পারাপারের একটি চিহ্নের কাছে। ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর জানায়। সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা ও দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, শিরশ্ছেদ করা ওই নারীর নাম লায়লা বিনতে আবদুল মুত্তালিব বাসিম। তার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়েটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।’। তাঁদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর। আমি শেষবারের মতো আমার ছেলের লাশ দেখতে চাই।’।
সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে সাদা পোশাক পরিহিত একজনকে তলোয়ার দিয়ে এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে দেখা যাচ্ছে। এটি ২০১৫ সালে সৌদি আরবে এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরনো ভিডিও। ওই নারী নিজের সৎকন্যাকে নির্যাতনের পর হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। বর্তমান ঘটনার সঙ্গে এই ভিডিওর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আদালতের রায় অনুসরণ করে নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আলোচিত ভিডিওর কয়েকটি স্থিরচিত্র নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে যুক্তরাজ্যের মিডল ইস্ট আই ও ডেইলি মেইল, ইসরায়েলের টাইমস অব ইসরায়েল ও পাকিস্তানের ডন-এর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি পরিবারকে জানান। নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, ‘ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে চলতি বছরের ৯ মে প্রকাশিত ‘সৌদি আরবে নিহত মুরাদের মরদেহ ১৬ দিন পর নিজ বাড়িতে’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
এছাড়া বিমানবন্দরের কফিনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে যে এটি ওই দুই বাংলাদেশির মরদেহ। তবে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্যমতে, এই দাবির সত্যতা নেই। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের অফিসপ্রধান শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের মরদেহ এখনো দেশে এসে পৌঁছায়নি। বিষয়টি নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক (কল্যাণ) ও অফিসপ্রধান শরিফুল ইসলামের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘লাশ এখনো আসেনি।’।
আরেকটি ভাইরাল ছবিতে কফিন বহন করতে দেখা গেছে, যাকে ওই দুই বাংলাদেশির মরদেহ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ছবিটি চলতি বছরের ৯ মে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত প্রবাসী মুরাদ শেখের মরদেহ দেশে ফেরার সময়ের। ওই দিন জানাজা শেষে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। এভাবেই অন্য এক প্রবাসীর মরদেহ আসার ছবি ব্যবহার করে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
এদিকে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিরা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন এবং ওমরাহ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে যে দাবি উঠেছে, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নজরুল ইসলামের বাবা আবদুল বাছির জানিয়েছেন, তার ছেলে অবিবাহিত ছিলেন এবং মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে মা–বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল।
২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি যাওয়ার আট মাস পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং এরপর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন।
পরিবারের দাবি, নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি মিথ্যা।
সৌদি আরবের সরকারি সূত্র ও জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে প্রথমে নিম্ন আদালত এবং পরে আপিল আদালতে ১৩ জন বিচারকের প্যানেল তাদের দণ্ড বহাল রাখে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কনস্যুলেট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বিষয়টি নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর ও পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে কূটনৈতিক পত্র দেওয়া হয়েছে। এতে মামলার বিস্তারিত বিবরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, ওই নারী তাঁর স্বামীর ছয় বছর বয়সী মেয়েকে নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের পর হত্যা করেছিলেন।
গত ১৮ অক্টোবর সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি সাখাওয়াত হোসেন নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, নিয়মিত বন্দিতালিকায় নাম থাকলেও কেন শাস্তির তথ্য জানানো হয়নি, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, জেদ্দার আলোচনায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, নিয়মিত পাঠানো বন্দিতালিকায় দুজনের নাম থাকলেও শাস্তির তথ্য কেন উহ্য রাখা হলো।
সামগ্রিকভাবে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পরিচয় ও ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব দাবি করা হচ্ছে, তার অধিকাংশেরই কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের অপপ্রচার নিহতদের পরিবারের জন্য যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি প্রবাসীদের নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করছে।





