৭ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি: মুসলিম বিশ্বে নতুন ভূকৌশলগত ভারসাম্য

Published: October 23, 2026, 4:52 pm

মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত ক্ষমতার সমীকরণকে পাশ কাটিয়ে তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ‘বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই চার মুসলিম দেশ সৌদি আরবকে বাইরে রেখে যে সামরিক ও কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তুলেছে, তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্টিফেনস মনে করেন, ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামো ছিল মূলত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি ও ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তানির্ভর। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করে স্বাধীন নিরাপত্তা বলয় তৈরিতে আগ্রহী। কাতারের মতো রাষ্ট্রগুলোও এখন আর একক কোনো আঞ্চলিক শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে নারাজ।

এই চুক্তির লক্ষ্য আগ্রাসন নয় বরং প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উৎপাদন ও কৌশলগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের প্রধান ড. এরদোগান কারাকুশ। তার ভাষ্যমতে, সৌদি আরব যখন পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, তখন আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বিকাশে মনোযোগ দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক ড. সিনা আজিজি জানান, সৌদি আরবকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত না করার পেছনে আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি মূল কারণ। কাতারের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি ও সৌদি আরবের এজেন্ডা দীর্ঘকাল ধরেই ভিন্নপথে চলছে, যার ফলে দোহা এখন নিজস্ব কৌশলগত মিত্র খুঁজে নিচ্ছে।

পাকিস্তানের সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক তালাত মাসুদ মনে করেন, তুরস্কের আধুনিক প্রযুক্তি, পাকিস্তানের পারমাণবিক অভিজ্ঞতা এবং কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তির মিলনস্থল হিসেবে এই জোট যেকোনো আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম। এটি মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের একক প্রভাবকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি সামরিক সমঝোতা নয়, বরং বহুমাত্রিক ক্ষমতার যুগে একটি নতুন ভূকৌশলগত বলয় তৈরির প্রয়াস। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সার্বভৌম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যা গাজায় যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ-চলাচলের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতেও প্রভাব ফেলতে পারে।