
৩৩ বছর বয়সে টেস্টিকুলার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার লড়াইটা নিক ম্যাডিনসনের জন্য ছিল বড় এক চ্যালেঞ্জ। ৯ সপ্তাহের কেমোথেরাপি এবং ছয় মাসব্যাপী পুনর্বাসন শেষে যখন তিনি মাঠে ফিরলেন, তখন তার সামনে দীর্ঘ ১৮ মাস কোনো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না। তবুও রাজ্য দলের অধিনায়কত্ব পাওয়া এবং সেঞ্চুরির আত্মবিশ্বাস তাকে আবার জাতীয় দলের আঙিনায় ফিরিয়ে আনে। চোটে পড়া দুই সতীর্থের বদলি হিসেবে টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়া ম্যাডিনসন ডারবানের কিংসমিডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নামেন ওপেনার হিসেবে। কিন্তু ৩৩ বলের সেই ইনিংস শেষ হয় শূন্য রানে, যা জন্ম দেয় তীব্র সমালোচনার। ধরুন, ৩৩ বছর বয়সে আপনার শরীরে টেস্টিকুলার ক্যানসার ধরা পড়ল। কিন্তু আপনার রাজ্য দল আপনাকে অধিনায়ক বানিয়ে দিল। আপনিও রাজ্য দলের হয়ে সেঞ্চুরি করলেন গত সেপ্টেম্বরে। এরপর খবর এল, জাতীয় দলের দুজন খেলোয়াড় চোটে পড়েছেন। চোট পাওয়া সেই দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে একজনের বদলি হিসেবে ডাক পেয়েছেন টেস্ট দলে ফেরার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রিকেট ভক্তরা সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলি কি ভেবেছিলেন ম্যাডিনসন এত বড় শারীরিক ধকল কাটিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর পর টেস্টে ফিরেই সেঞ্চুরি করবেন? কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল সিডনি মর্নিং হেরাল্ডে লিখেছেন, কোনো ভালো শিপিং কোম্পানি যেমন পুরোনো জাহাজকে চরম শীতে সমুদ্রে পাঠায় না, নির্বাচকরাও ঠিক সেই ঝুঁকিপূর্ণ জুয়াই খেলেছেন। তার মতে, এমন একজন ক্রিকেটারকে ওপেনিংয়ে নামানো ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। এই টেস্টে নামার আগে উল্লিখিত পটভূমিও তাঁর। অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’-এ লেখা কলামের প্রথম লাইনেই ধুয়ে দিয়েছেন, ‘একটি ভালো শিপিং কোম্পানি কখনো পুরোনো জাহাজগুলোকে চরম শীতের মধ্যে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকে না।
ম্যাডিনসনের এই শূন্য রান তাকে টেস্ট ইতিহাসের অনাকাঙ্ক্ষিত এক রেকর্ডের মালিক করেছে। ছেলেদের টেস্টে ওপেনার হিসেবে সবচেয়ে বেশি বল খেলে শূন্য রানে আউট হওয়ার তালিকায় তিনি এখন তৃতীয়। ১৯৯৫ সালে ডানেডিন টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৯ বল খেলে শূন্য করেছিলেন ড্যারিন মারে, আর ২০০০ সালে কিংস্টনে জিম্বাবুয়ের ট্রেভর গ্রিপার করেছিলেন ৩৬ বলে শূন্য। এছাড়া নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম ও সাম্প্রতিক টেস্টেও শূন্য রানে আউট হওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন ৩৪ বছর ২৯ দিন বয়সী এই ব্যাটার। এর মধ্যে ২০১৬ সালের নভেম্বরে অ্যাডিলেডে প্রথম টেস্টে জীবনের প্রথম ইনিংসেও আউট হন ১২ বলে শূন্য রান করে।
ম্যাডিনসনের ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের পর তিনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কোনো টেস্ট খেলেননি। তার অনুপস্থিতিতে দল ৯০টি টেস্ট খেলেছে, যা অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে দুই টেস্টের মাঝে খেলোয়াড় মিস করার নতুন রেকর্ড। এর আগে টিম পেইন ও ব্র্যাড হগের রেকর্ড ছিল ৮০ টেস্টের। যদিও ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ম্যাডিনসন ৫২.৩৭ গড়ে রান করেছিলেন, যা সেই সময়ে ২০ ইনিংস খেলা ব্যাটারদের মধ্যে ক্যামেরন গ্রিনের পরেই ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু ক্যানসার পরবর্তী সময়ে ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১১ ইনিংসে মাত্র একটি ফিফটি ছিল তার অর্জন।
নির্বাচকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ম্যাডিনসন ব্যাটিং অর্ডারে নমনীয়তা আনবেন এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে তার ওপেন করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড ও নির্বাচক প্রধান বেইলির এই দর্শনের সঙ্গে মিল থাকলেও মার্ক ওয়াহর মতো বিশ্লেষকদের মতে, কুপার কনোলি এক্ষেত্রে ভালো বিকল্প হতে পারতেন। মার্ক ওয়াহ মনে করেন, পুরো ইনিংসে ম্যাডিনসনকে বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল এবং তার এই বিপর্যয়ের দায় মূলত সেই নির্বাচকদেরই, যারা তাকে পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
ম্যাডিনসন এখন প্রশ্নবিদ্ধ পরিস্থিতির কেন্দ্রে। এখন পর্যন্ত তার টেস্ট ক্যারিয়ার মোটে চারটি ম্যাচের। ডারবান টেস্টের পর তার দলে টিকে থাকা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন উঠছে, অস্ট্রেলিয়া কি আর কোনো যোগ্য ওপেনার খুঁজে পাচ্ছিল না, নাকি এটি কেবলই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার এক নিষ্ঠুর পরীক্ষা ছিল? ক্যানসার জয় করে ফিরে আসা এই ক্রিকেটারের শূন্যের দায়ভার এখন ভাগাভাগি হচ্ছে তার নিজের, নির্বাচকদের এবং সামগ্রিক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট ব্যবস্থাপনার ওপর।





