
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে রেখেছিল তেহরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। আজ শুক্রবার কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, সম্প্রতি তেহরান চার দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।
বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত জ্বালানি তেলের ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে জুলাই মাসে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে সম্প্রতি ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দাম জানিয়েছেন, তেহরান ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজের ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
আমির হায়াত মোকাদ্দামের ভাষ্যমতে, এই চার দেশের জাহাজ বর্তমানে কোনো বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও এখন সেগুলোতে হস্তক্ষেপ করছে না। আর অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় তাদের জাহাজগুলো কি সত্যিই অবাধে চলাচল করতে পারবে।
তবে এই সুযোগ পাওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও চীনের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য সম্পর্ক এবং ভারতের সাথে ওষুধ আমদানির বিষয়টি এই ছাড়ের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। কাতারের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন, কারণ দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে এবং শুরু থেকেই তেহরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িত’, যোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে, ‘ইরান থেকে আসা বা ইরানের উদ্দেশে যাত্রা করা চীন ও ভারতের জাহাজও এই ছাড়ের আওতায় আসবে।’।
ইরানি এই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, চীন ও ভারতের জাহাজ থেকে ইরান ট্রানজিট ফি আদায় করবে, যদিও কাতারের জন্য এই পথ অনেকটা বিনা ফিতেই উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ইরাকি জাহাজগুলোর ওপর কোনো মাশুল ধার্য করা হবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক আলোচনার চেয়ে তেল রপ্তানি ও হরমুজ প্রণালির অবাধ চলাচলকে আলাদা রাখতে চাইছে তেহরান। ইরাকি জাহাজকে মাশুল দিতে হবে কি না, তা তিনি জানাননি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমি বলেন, ‘সম্ভবত ইরান এসব জাহাজকে বাধাহীনভাবে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে ট্রানজিট ফি বা পণ্যের মূল্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ আদায় করছে।’। রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য চারটি দেশই হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে ট্রাম্পের আচরণে দুই দেশই হতাশ হয়েছে।’। এর অর্থ জাহাজের নিবন্ধিত পতাকাবাহী দেশ, মালিকানা, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, নাকি অন্য কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা, তা জানা যায়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, ইরাককে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে ইরান তার প্রতিবেশী শিয়া-প্রধান এই দেশটির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করতে চায়। তবে এই সুবিধা পাওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ভারত ও কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে তাদের সম্পর্কের সমীকরণ এই সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক এবং লিবিয়ায় অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে উলফগ্যাং পুস্তাই আল জাজিরাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে তেহরান এই উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারে।
কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মিউ শু জানিয়েছেন, অক্টোবরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন উপসাগরীয় অঞ্চলের ১ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে, যার ৪২ শতাংশ চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে গেছে। আগস্টে কাতার কোনো এলএনজি পরিবহন করতে না পারলেও অক্টোবরে ১৮ লাখ টন এলএনজি পাঠিয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে ইরাকের তেল রপ্তানি ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। একই সময়ে কাতারের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ দৈনিক ৫ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল থেকে কমে ১ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। শু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের উৎস শনাক্ত করতে পারেনি কেপলার। তিনি বলেন, ‘সমঝোতার বিষয়টি সত্যি হলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ওপরও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে।’। এতে সাতটি শর্ত পূরণ করা হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অবশ্য জানিয়েছে, তাদের নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে। তবে তারা স্পষ্ট করেছে যে, ইরানের বন্দর এড়িয়ে চলা জাহাজ বা অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী জাহাজের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল করা যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিশেষ ছাড় দেওয়া জাহাজগুলোর তালিকা এবং এর সংজ্ঞা এখনো অস্পষ্ট। সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও মানবাধিকার অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক এবং ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক রুজবে পারসি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের আইনপ্রণেতা যে কারণগুলো তুলে ধরছেন, সেগুলোই যদি ছাড় দেওয়ার পেছনের যুক্তি হয়, তাহলে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াই বলে দেবে, এ কৌশল সফল হচ্ছে কি না।’। তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন ইরানের এই উদ্যোগ মেনে নিলে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।’। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর শান্তি আলোচনায় বসার আগে অবরোধ প্রত্যাহার তেহরানের অন্যতম শর্ত।
ইরানি বন্দর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নিয়েও সংশয় রয়ে গেছে। বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, আপাতত এই ছাড়ের প্রভাব খুবই সীমিত। তবে ইরান যদি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে একটি বৃহৎ শান্তিচুক্তির দিকে অগ্রসর হয়, তবেই এর দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, ‘বাজার আবারও শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে।
ছাড় মিললেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কাতার গ্যাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি জানিয়েছে, ৩০ অক্টোবর তাদের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’ অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এই অঞ্চলে হামলার শিকার হয়েছে, যা অঞ্চলটিতে চলমান অস্থিরতারই প্রতিফলন।





